কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৯ ।। দ্বৈত নাগরিকত্ব: আইনের ভাষা বনাম নির্বাচনী বাস্তবতা

কলিকালের কলধ্বনি  ।।  ৫৯ ।।  দ্বৈত নাগরিকত্ব: আইনের ভাষা বনাম নির্বাচনী বাস্তবতা

কলিকালের কলধ্বনি  ।।  ৫৯ ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

দ্বৈত নাগরিকত্ব: আইনের ভাষা বনাম নির্বাচনী বাস্তবতা

উৎসর্গ

সকল নিরীহ বাংলাদেশির প্রতি

নির্বাচন এলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু পুরোনো প্রশ্ন নতুন করে ফিরে আসে। কখনো আচরণবিধি, কখনো প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আবার কখনো সংবিধানের ব্যাখ্যা। দ্বৈত নাগরিকত্ব তেমনই এক পুরোনো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্ন—যেখানে আইন, নৈতিকতা ও রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জট পাকিয়ে থাকে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো সেই জট আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।

খবরে দেখা যাচ্ছে, দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে যাদের মনোনয়ন রিটার্নিং কর্মকর্তারা বাতিল করেছিলেন, আপিলে এসে তাদের বড় অংশই প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের যুক্তি—আইনজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে তারা ‘নমনীয়’ হয়েছে। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন, অ্যাফিডেভিট ও ফি জমার প্রমাণ থাকলেই মনোনয়ন বৈধ। এখানেই প্রশ্নটি ধারালো হয়ে ওঠে: নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা আর নাগরিকত্ব আইনগতভাবে ত্যাগ করা—এই দুটো কি আদৌ এক জিনিস?

সংবিধান কিন্তু এ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট নয়। ৬৬ অনুচ্ছেদ স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছে—দ্বৈত নাগরিক কেউ সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশও একই কথা পুনরুচ্চারিত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ও এই ব্যাখ্যার বাইরে যাওয়ার সুযোগ রাখে না। অর্থাৎ, বিদেশি নাগরিকত্ব পুরোপুরি ও আইনগতভাবে ত্যাগ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সে বাস্তবতায় কেবল একটি অঙ্গীকারনামা বা ‘প্রক্রিয়াধীন আবেদন’-এর ওপর দাঁড়িয়ে প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হলে সেটি সংবিধানের ভাষার সঙ্গে নয়, বরং সংবিধানের ফাঁক খোঁজার একটি প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলছে, তারা পক্ষপাতিত্ব করেনি। কিন্তু প্রশ্নটি ব্যক্তিগত পক্ষপাতের নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যার। সংবিধান যেখানে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশনের কাজ কি আইনকে শিথিলভাবে ব্যাখ্যা করা, নাকি আইন হুবহু প্রয়োগ করা? বাস্তবতা হলো, নির্বাচন কমিশন যদি একবার ‘নমনীয়তা’ দেখানোর পথে হাঁটে, তাহলে আগামী দিনে এই নমনীয়তার সীমা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—সে প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই উঠে আসে।

এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। প্রবাসী বাংলাদেশিরা অর্থনীতি, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো চায়, সেই অভিজ্ঞতা সংসদে প্রতিফলিত হোক। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে গিয়ে সংবিধানকে পাশ কাটানো কি গ্রহণযোগ্য? প্রবাসী প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন থাকলে তার সমাধান সংসদে আইন সংশোধনের মাধ্যমে আসতে পারে, নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যাগত নমনীয়তার মাধ্যমে নয়।

দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নটি কেবল কাগজে-কলমে পরিচয়ের নয়; এটি আনুগত্যের প্রশ্নও। সংসদ সদস্য মানে শুধু ভোটের প্রতিনিধি নন, তিনি রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অংশীদার। যুদ্ধ ও শান্তি, পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, বাজেট—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যদি একজন আইনপ্রণেতার আরেকটি রাষ্ট্রের প্রতিও আনুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা থাকে, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি কারও ব্যক্তিগত সততার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রশ্ন।

বিশ্বের অভিজ্ঞতাও এই বিষয়ে বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে দ্বৈত নাগরিকরা কংগ্রেসে যেতে পারেন, তবে প্রেসিডেন্ট হতে হলে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক হওয়া বাধ্যতামূলক। যুক্তরাজ্যে দ্বৈত নাগরিক এমপি হওয়ায় বাধা নেই, কিন্তু সেখানে শতাব্দীপ্রাচীন সংসদীয় ঐতিহ্য ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া সম্পূর্ণ বিপরীত পথ নিয়েছে। সংবিধানের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকরা সংসদ সদস্য হতে পারেন না—২০১৭ সালে একের পর এক এমপির পদ বাতিল হওয়ার ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। ভারতও একইভাবে কঠোর; সেখানে দ্বৈত নাগরিকত্ব রেখে সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই।

এই তুলনাগুলো আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন কোনো আবেগী বা সুবিধাজনক সিদ্ধান্তে মীমাংসা করার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দর্শন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানগত সক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ কোন মডেল অনুসরণ করবে, সেটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু যতক্ষণ সংবিধান অপরিবর্তিত থাকবে, ততক্ষণ তার স্পষ্ট বিধান উপেক্ষা করার কোনো নৈতিক বা আইনি যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন।

দ্বৈত নাগরিকদের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া উচিত কি না—এই বিতর্ক হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বিতর্কের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত সংসদে, আইনের মাধ্যমে। সংবিধান সংশোধন করে যদি জাতি সিদ্ধান্ত নেয় যে নির্দিষ্ট শর্তে দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণ অনুমোদনযোগ্য, সেটি হবে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পথ। তার আগে পর্যন্ত ‘আবেদন করেছি’—এই যুক্তিতে সংবিধানের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাকে শিথিল করা হলে প্রশ্ন উঠবেই। আর গণতন্ত্রে প্রশ্ন ওঠা কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা নয়; বরং সেটাই আইন ও প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রথম শর্ত।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২১ জানুয়ারি ২০২৬