ইউরোপ সংবাদ
জার্মান অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা, এক বছরে বন্ধ প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোম্পানি
ইউরোপ প্রতিনিধি, ২১ আগস্ট:
জার্মান অর্থনীতিতে ব্যবসা বন্ধের প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোম্পানি তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। গবেষকদের মতে, এটি শুধু দুর্বল আর্থিক অবস্থার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়; ভালো অবস্থায় থাকা অনেক ব্যবসাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বাজার ছাড়ছে।
জার্মানির লাইবনিজ সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান ইকোনমিক রিসার্চ (জেডইডব্লিউ) ও ক্রেডিটরিফর্মের যৌথ বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৪ সালেও প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার ১০০ প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বন্ধ করেছিল, যা ছিল ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। অর্থাৎ টানা দ্বিতীয় বছর দেশটির কোম্পানি বন্ধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জেডইডব্লিউর গবেষক সান্দ্রা গটশাল্কের মতে, উচ্চ জ্বালানি ও কর্মী ব্যয়, দক্ষ জনবলের সংকট এবং অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশ এখন প্রায় সব খাতকেই চাপে ফেলেছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপও যুক্ত হয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে নেওয়ার পরিবর্তে আগেভাগেই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা লেগেছে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও আতিথেয়তা খাতে। ২০২৫ সালে এ খাতে প্রায় ১৫ হাজার প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, যা এক বছরের ব্যবধানে ১৫ শতাংশ বেশি। উচ্চ শ্রম ও পরিচালন ব্যয়ের পাশাপাশি দক্ষ কর্মী পাওয়া কঠিন হওয়ায় ছোট ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে এ খাতে প্রায় ১১ হাজার প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে সরে গেছে। এর মধ্যে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার ও ক্লিনিক বন্ধের ঘটনা বিশেষভাবে বেড়েছে। প্রায় ৫ হাজার ৫০০ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। গবেষকদের মতে, বহু চিকিৎসক অবসরে যাচ্ছেন, কিন্তু তাদের ব্যবসা বা চেম্বার পরিচালনার মতো উপযুক্ত উত্তরসূরি পাওয়া যাচ্ছে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বিপুলসংখ্যক ব্যবসা বন্ধের মাত্র ১৩ শতাংশের সঙ্গে সরাসরি দেউলিয়া হওয়ার আইনি প্রক্রিয়া যুক্ত। অর্থাৎ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আদালতের মাধ্যমে দেউলিয়া ঘোষিত হয়ে বন্ধ হয়নি; মালিকেরা নিজেরাই ব্যবসা গুটিয়েছেন অথবা প্রতিষ্ঠান আর অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় না থাকায় বাজার থেকে বাদ পড়েছে।
পরিবারভিত্তিক ব্যবসাগুলোর ক্ষেত্রেও জনমিতিক পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৫ সালে স্বেচ্ছায় বন্ধ হয়ে যাওয়া মালিকানাধীন পারিবারিক ব্যবসার প্রায় ২৯ শতাংশের মালিকের বয়স ছিল ৬৫ বছর বা তার বেশি। ২০০২ সালে এই হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যবসা হস্তান্তরের সংকটও জার্মানির কোম্পানি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বড় কোম্পানির সংকটের চেয়ে নীরবে হারিয়ে যাওয়া ছোট ও মাঝারি ব্যবসার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হতে পারে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও বহু বছরের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাও হারিয়ে যাচ্ছে।