‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৩। । আহা রে প্রবাসী!
আহা রে প্রবাসী!
উৎসর্গ
সেই সব প্রবাসীর প্রতি—
যারা আপনজনের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে
নিজের জীবনটাই বিসর্জন দেন।
জামাল উদ্দিনের স্মৃতির প্রতি।

—‘চাচা, আপনি এখানে কীভাবে এলেন?’
জামাল উদ্দিন কোনো উত্তর দেন না।
রাতের অন্ধকার তখনও পুরোপুরি কাটেনি। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মানুষটির চোখ দুটো খোলা। ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না।
শরীরের ওপর বৃষ্টির পানি। পরনের কাপড় ভিজে একাকার।
—‘চাচা, আপনাকে এখানে কে রেখে গেছে?’
এবারও কোনো উত্তর নেই।
শুধু অসহায় চোখে একবার তাকান জামাল। যেন অনেক কিছু বলতে চান, কিন্তু শরীর তাকে কথা বলার অনুমতি দিচ্ছে না।
ভোরের আলো একটু একটু করে বাড়তে থাকে। আশপাশের মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন।
কেউ পানি এগিয়ে দেন, কেউ শরীরের ওপর কাপড় চাপিয়ে দেন।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—৫৫ বছরের এই অসুস্থ মানুষটি গভীর রাতে রাস্তার পাশে এলেন কীভাবে?
জামাল তখনও চুপ।
তার শরীর ভেঙে পড়েছে। দুটো কিডনিই প্রায় অচল। দাঁড়ানোর শক্তি নেই।
অথচ এই মানুষটিই মাত্র কয়েক মাস আগেও দেশের বাইরে ছিলেন।
সৌদি আরবের মাটিতে কাটিয়েছেন জীবনের ১২টি বছর।
পরিবারের জন্য।
সংসারের জন্য।
সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য।
প্রবাসে থাকা মানুষগুলো যেমন করে—নিজের কষ্ট আড়াল করে টাকা পাঠিয়েছেন দেশে।
দূরদেশে ঘাম ঝরিয়েছেন। আপনজনদের কাছ থেকে দূরে থেকেছেন।
স্বজনদের ভাষ্য, উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই স্ত্রীর নামে পাঠিয়েছেন।
হয়তো তখন তিনি ভাবেননি, একদিন সেই টাকার হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে তার অসুস্থ শরীর।
প্রায় তিন মাস আগে দেশে ফিরেছেন জামাল।
সঙ্গে করে এনেছেন ভয়াবহ অসুস্থতা। তার দুই কিডনিই বিকল হয়ে গেছে। শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তারপর কী ঘটেছে?
এই প্রশ্নের উত্তরই যেন ছড়িয়ে আছে সেই রাতের অন্ধকারে।
১ আগস্ট গভীর রাতে কালমেঘা এলাকায় নিজের পৈতৃক ভিটার কাছের একটি রাস্তায় তাকে পাওয়া যায়।
অভিযোগ ওঠে, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা তাকে সেখানে রেখে গেছেন।
কিন্তু কেন?
কেউ বলেন, পারিবারিক বিরোধ ছিল।
কেউ বলেন, চিকিৎসার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আবার জামালের স্ত্রী ভিন্ন কথা বলেন।
তার দাবি, প্রায় আড়াই মাস আগেই তিনি জামালকে তালাক দিয়েছেন। আইনগতভাবে তিনি আর তার স্ত্রী নন।
তাই তাকে গাড়িতে করে তার নিজ গ্রামে রেখে আসা হয়েছিল।
সত্যিটা কী?
সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো জামালের সঙ্গে চলে যায় তার জীবনের শেষ প্রান্তে।
তবে তখনও তিনি বেঁচে ছিলেন।
আর বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছিলেন।
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মানুষটিকে শেষ পর্যন্ত তুলে নেন তার ভাতিজি ইসমত আরা।
নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।
বাড়িতে মাত্র একটি ঘর। তবু অসুস্থ চাচার জন্য বারান্দায় জায়গা করে দেন।
একটি ছোট্ট বারান্দা তখন হয়ে ওঠে জামালের নতুন ঠিকানা।
এরপর এগিয়ে আসেন গ্রামের মানুষ।
কেউ টাকা দেন, কেউ চিকিৎসার জন্য দৌড়ান, কেউ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে জামালকে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসা চলতে থাকে।
সবাই অপেক্ষা করেন—হয়তো মানুষটি সুস্থ হয়ে উঠবেন।
হয়তো আবার কথা বলবেন।
হয়তো একদিন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাড়ির উঠানে হাঁটবেন।
হয়তো বলবেন—
‘আমাকে আর কারও বোঝা হতে হবে না।’
কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষটা সুখের হয়নি।
হাসপাতালে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় কয়েক দিন পর জামালকে আবার ভাতিজির বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।
সেই ছোট্ট বারান্দাতেই কেটে যায় তার শেষ সময়।
সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটা।
চারপাশ তখন স্বাভাবিক।
কিন্তু একটি ঘরের বারান্দায় থেমে যাচ্ছে একজন মানুষের দীর্ঘ লড়াই।
জামাল উদ্দিন আর নেই।
সৌদি আরবে কাটানো ১২ বছরের প্রবাসজীবন, পরিবারের জন্য পাঠানো অর্থ, অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পরের নিঃসঙ্গতা—সবকিছু পেছনে ফেলে তিনি চলে গেলেন।
মৃত্যুর পরও তার জন্য অপেক্ষা করছে আরেকটি বাস্তবতা।
দাফনের জন্যও গ্রামবাসীকে চাঁদা তুলতে হচ্ছে।
একজন মানুষ জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টি পরিবারের জন্য বিদেশে কাটালেন।
হয়তো তার পাঠানো টাকায় সংসারের অনেক প্রয়োজন মিটেছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছে, ঘরে স্বচ্ছলতা এসেছে।
কিন্তু শেষ সময়ে তার নিজের জন্য প্রয়োজন হলো—একটি বারান্দা, কয়েকজন মানুষের মমতা আর গ্রামের মানুষের চাঁদা।
প্রবাসীদের গল্প এমনই।
দূরদেশে তারা পরিবারের স্বপ্ন হয়ে বাঁচেন।
তাদের পাঠানো টাকা ঘরে পৌঁছায়, কিন্তু তাদের কষ্টের খবর অনেক সময় পৌঁছায় না।
তারা সন্তানদের বড় হতে দেখেন ছবিতে।
বাবা-মায়ের বার্ধক্য দেখেন ফোনের পর্দায়।
ঈদের আনন্দ ভাগ করেন দূরদেশ থেকে।
নিজের যৌবন দিয়ে অন্যের ভবিষ্যৎ গড়ে দেন।
কিন্তু একদিন যখন শরীর আর সঙ্গ দেয় না, তখন সেই প্রবাসীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়—একটি পরিচিত হাত, একটি নিরাপদ আশ্রয়, আর দুটি মমতাময় চোখ।
জামাল উদ্দিন শেষ পর্যন্ত সেই আশ্রয় পুরোপুরি পাননি।
তবে শেষ মুহূর্তে কিছু মানুষ তাকে একা থাকতে দেননি।
তার ভাতিজি তাকে তুলে নিয়েছিলেন রাস্তা থেকে।
গ্রামের মানুষ চিকিৎসার জন্য টাকা তুলেছিলেন।
তারা শেষ পর্যন্ত দাফনের ব্যবস্থাও করছেন।
রক্তের সম্পর্কের বাইরে গিয়ে এই মানুষগুলো প্রমাণ করেছেন—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় শেষ পর্যন্ত মানুষ হওয়াই।
জামালের গল্প তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি সেই লাখো কোটি প্রবাসীর গল্প, যারা জীবনের সোনালি সময়টুকু আপনজনের ভবিষ্যতের জন্য বিসর্জন দেন।
তাদের ঘাম দেশে টাকা হয়ে ফেরে, কিন্তু তাদের নিঃসঙ্গতা ফেরে না।
কখনো কখনো তারা ফিরে আসেন কেবল একটি ক্লান্ত শরীর নিয়ে।
তখন তাদেরও মনে হয়তো একটি প্রশ্ন জাগে—
‘যাদের জন্য এতটা পথ পাড়ি দিলাম, শেষ সময়ে তারা কি আমার পাশে থাকবে?’
জামাল উদ্দিন সেই প্রশ্নের উত্তর আর জানতে পারলেন না।
আহা রে প্রবাসী!
লন্ডন, ২০ আগস্ট ২০২৬