বিশ্ব সংবাদ
চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে হোটেলে আগুনে কুষ্টিয়ার সাংবাদিকসহ ৯ জন নিহত
কোলকাতা প্রতিনিধি, ২০ আগস্ট:
ভারতের কলকাতায় চিকিৎসার জন্য গিয়ে আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ পাঁচ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বুধবার ভোরে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ভবনে একাধিক হোটেল ও আবাসিক স্থাপনা ছিল। আগুনে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিহত বাংলাদেশিরা হলেন—কুষ্টিয়ার সাংবাদিক ও দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শিম্মিন, তাঁদের দুই বছরের ছেলে স্বর্ণাশিষ দত্ত, আফসানার বাবা আকরাম আলী এবং ঢাকার সাভারের আহমেদ বাবু। দেবাশীষের পরিবারের চারজনই কুষ্টিয়ার বাসিন্দা।
দেবাশীষ দত্ত স্ত্রী আফসানার চিকিৎসার জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে তারা কলকাতায় পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকেই বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু ফেরার আগেই ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিল পুরো পরিবারের চার সদস্যকে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাত প্রায় পৌনে ২টার দিকে ভবনের একটি অংশে আগুন লাগে। মুহূর্তেই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বিভিন্ন কক্ষ। ভবনটির কাঠামো ছিল ঘিঞ্জি এবং অনেক কক্ষে পর্যাপ্ত জানালা ছিল না। সরু সিঁড়ি ও জরুরি বের হওয়ার ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে আগুনের সময় বের হতে গিয়ে বিপাকে পড়েন অতিথিরা। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা হলেও নয়জনের মৃত্যু হয়।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। শর্ট সার্কিটসহ বিভিন্ন সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পর কলকাতা প্রশাসন হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।
এই ঘটনায় কুষ্টিয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুতে সহকর্মী ও স্থানীয় সাংবাদিকরা গভীর শোক জানিয়েছেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে একই পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বাংলাদেশি চিকিৎসা-ভ্রমণকারীদের নিরাপদ আবাসন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

কোলকাতা কি চিকিৎসার শহর, নাকি ঝুঁকির আবাসন?
বাংলাদেশিদের কাছে কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসার একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। কাছাকাছি হওয়া, ভাষাগত সুবিধা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য সেখানে যান।
কিন্তু এই ঘটনার পর একটি বিষয় নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—চিকিৎসার জন্য কলকাতা যাওয়া আর নিউ মার্কেট বা আশপাশের পুরোনো, ঘিঞ্জি ও সস্তা হোটেলে থাকা কি একইভাবে নিরাপদ?
অবশ্যই নয়।
কম খরচে থাকার জন্য রোগী ও স্বজনেরা অনেক সময় পুরোনো ভবনের ছোট হোটেল বেছে নেন। অথচ একজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা করাতে গেলে হাসপাতালের মান যাচাইয়ের পাশাপাশি থাকার জায়গার অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, সিঁড়ি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও ভবনের সামগ্রিক নিরাপত্তাও যাচাই করা জরুরি।
কলকাতায় চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার জন্য গিয়ে জীবনের নিরাপত্তাকে সস্তা হোটেলের হাতে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

নিউ মার্কেটের এই আগুন তাই শুধু একটি হোটেল দুর্ঘটনা নয়; বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া হাজারো মানুষের জন্য এটি একটি কঠিন সতর্কবার্তা— হাসপাতাল বাছাইয়ের পাশাপাশি থাকার হোটেলটি কতটা নিরাপদ, সেখানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমন আছে কি না—সেটিও যাচাই করা জরুরি। নিউ মার্কেটের এই মর্মান্তিক ঘটনা দেখিয়ে দিল, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশে গেলেও নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জীবন রক্ষারই অংশ।