বাংলাদেশ সংবাদ

২১ আগস্ট: ২৪ প্রাণের রক্তাক্ত স্মৃতি, দুই দশক পরও যে প্রশ্নের শেষ নেই

২১ আগস্ট: ২৪ প্রাণের রক্তাক্ত স্মৃতি, দুই দশক পরও যে প্রশ্নের শেষ নেই

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২১ আগস্ট:

একটি রাজনৈতিক সমাবেশ। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা। চারদিকে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। বক্তৃতা শেষ হওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ বিকট শব্দ। একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ। মুহূর্তেই উৎসবের সমাবেশ পরিণত হলো রক্তাক্ত প্রান্তরে।

সেদিন ছিল ২১ আগস্ট ২০০৪।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় শেষ পর্যন্ত ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শত শত মানুষ। হামলায় শেখ হাসিনাও আহত হন। আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান গুরুতর আহত হয়ে তিন দিন পর, ২৪ আগস্ট, হাসপাতালে মারা যান।

আজ সেই ঘটনার ২২ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু ২১ আগস্টের স্মৃতি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের শোকের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তদন্ত ও বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘ বিতর্কেরও একটি বড় অধ্যায়।

মঞ্চে শেখ হাসিনা, তারপর বিস্ফোরণ

২০০৪ সালের সেই সমাবেশে শেখ হাসিনা ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি। তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই সমাবেশস্থলে গ্রেনেড হামলা শুরু হয়। হামলার লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা—এমন অভিযোগই পরবর্তী তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

হামলার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে ঘটনাস্থলেই বহু মানুষ প্রাণ হারান। আহতদের ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিহতের সংখ্যা পরে বেড়ে ২৪-এ দাঁড়ায়।

শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণশক্তিতে প্রভাব পড়ে এবং তিনি আহত হন। কিন্তু তাঁর চারপাশের বহু মানুষ আর ঘরে ফিরতে পারেননি।

আইভি রহমানের মৃত্যু সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে। হামলার সময় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট মারা যান।

মামলা হলো, তদন্ত হলো—তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা

হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা হয়। তদন্তের পথ শুরু থেকেই ছিল বিতর্কিত। পরবর্তী সময়ে তদন্ত নতুন করে শুরু হয় এবং ২০০৮ সালে সিআইডি ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। পরে আরও তদন্তের পর সম্পূরক অভিযোগপত্রে নতুন আসামি যুক্ত করা হয়; এর মধ্যে তৎকালীন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা তারেক রহমানসহ আরও কয়েকজনের নাম আসে।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া।

হামলার ১৪ বছর পর, ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ রায় ঘোষণা করেন।

সেই রায়ে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু। তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

তখন মনে হয়েছিল, দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২১ আগস্টের বিচার বুঝি শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

কিন্তু আইনের পথ তখনো অনেক বাকি।

২০১৮-এর রায় থেকে ২০২৪-এর উল্টো মোড়

মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ায় মামলাটি বাধ্যতামূলকভাবে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে যায়। একই সঙ্গে দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন। বছরের পর বছর শুনানি চলার পর ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে সব আসামিকে খালাস দেন।

হাইকোর্টের যুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—যে সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে বিচার হয়েছিল, সেটির আইনগত বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। আদালত সেই অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে হওয়া বিচারপ্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে ২০১৮ সালের দণ্ডাদেশ আর বহাল থাকেনি।

এই রায়ের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রপক্ষ কি আপিল করবে?

রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে।

সর্বশেষ ফলাফল: সুপ্রিম কোর্টেও খালাস বহাল

এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বশেষ অধ্যায় আসে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্টের দেওয়া সব আসামির খালাসের রায় বহাল থাকে।

অর্থাৎ, বর্তমান আইনি অবস্থায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে দণ্ডিত কোনো আসামির সাজা বহাল নেই।

এটি ২১ আগস্টের ইতিহাসে একটি নাটকীয় মোড়।

একদিকে ২০০৪ সালের হামলায় ২৪ মানুষের মৃত্যু, শত শত মানুষের আহত হওয়া এবং শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ। অন্যদিকে ২০১৮ সালের বিচারিক আদালতের কঠোর দণ্ড। এরপর ২০২৪ সালে হাইকোর্টের সর্বাত্মক খালাস এবং ২০২৫ সালে আপিল বিভাগে সেই খালাস বহাল—পুরো বিচারিক ইতিহাস যেন একটি পূর্ণ বৃত্তে ফিরে এসেছে।

তাহলে ২৪টি প্রাণের হত্যাকারী কারা?

এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি।

আদালতের সর্বশেষ রায়ের পর ২১ আগস্ট হামলার মামলায় বর্তমানে কোনো আসামির বিরুদ্ধে দণ্ড বহাল নেই। ফলে ২৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কারা অপরাধী—এই প্রশ্নের একটি চূড়ান্ত দণ্ডাদেশভিত্তিক উত্তর এখন আর ২০১৮ সালের রায়ের মাধ্যমে দেওয়া যায় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে হামলার ঘটনা নিয়ে কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। বরং দুই দশকের বেশি সময় ধরে তদন্ত, পুনঃতদন্ত, অভিযোগপত্র, সম্পূরক অভিযোগপত্র, বিচার, আপিল—সবই হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ বিচারিক অবস্থান হলো, আগের বিচারপ্রক্রিয়ার ভিত্তি নিয়েই আদালতে গুরুতর আইনগত প্রশ্ন উঠেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় দেওয়া দণ্ড বাতিল হয়েছে।

এই জায়গাটিই ২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় আইনি ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

রাজনীতির বাইরে যে প্রশ্নটি থেকে যায়

২১ আগস্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি বহুবার উত্তপ্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে এটিকে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পিত হামলা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে বিএনপি ২০১৮ সালের বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে একটি নির্মম বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—২৪ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন।

তাঁদের কেউ ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী, কেউ নেতা, কেউ ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে। আইভি রহমানের মতো একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রীও সেই হামলার শিকার হন। আরও শত শত মানুষ শরীরে ও মনে সেই দিনের ক্ষত বহন করেছেন।

একটি রাষ্ট্রের কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু কে কোন দলের—তা নয়।

প্রশ্ন হলো, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে একটি নির্ভরযোগ্য, আইনসম্মত এবং টেকসই বিচার কি শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে?

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায়ের পর অন্তত এই মামলার বর্তমান অবস্থান বলছে—২০১৮ সালের দণ্ডাদেশ আর আইনগতভাবে টিকে নেই।

২১ আগস্টের উত্তরাধিকার

২১ আগস্ট এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কালো তারিখ। প্রতি বছর দিনটি ফিরে আসে, ফিরে আসে বিস্ফোরণের শব্দ, রক্তাক্ত মানুষের ছবি, হাসপাতালে ছুটে চলা স্বজনদের স্মৃতি এবং আইভি রহমানসহ নিহতদের নাম।

কিন্তু ২২ বছর পর এই দিনটির সামনে দাঁড়িয়ে শুধু অতীত স্মরণ করলেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে না।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করার চেষ্টা যে কোনো অবস্থায় ভয়াবহ অপরাধ। একইভাবে, এমন অপরাধের বিচারও হতে হয় এমনভাবে, যাতে সেই বিচার ভবিষ্যতে প্রমাণ, আইন ও ন্যায়বিচারের পরীক্ষায় টিকে থাকে।

২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।

২৪টি প্রাণের মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের শোক নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের কাছে রেখে যাওয়া ২৪টি প্রশ্ন।

দুই দশক পেরিয়ে সেই প্রশ্নগুলোর রাজনৈতিক উত্তর বহুবার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনের আদালতে সর্বশেষ যে অবস্থান দাঁড়িয়েছে, তাতে ২১ আগস্টের হামলার দায়ে কোনো আসামির দণ্ড আর বহাল নেই।

তাই ২১ আগস্ট আজ শুধু স্মরণের দিন নয়—এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সত্য অনুসন্ধানের ইতিহাসের একটি অসমাপ্ত অধ্যায়ের নাম।