কলিকালের কলধ্বণি-৪৯।। পোশাকশ্রমিক দিপু ও শিশু আয়েশা গুজব আর মবের বলী: এত এত নৃশংস ঘটনা কিভাবে বলি ?

কলিকালের কলধ্বণি-৪৯।।   পোশাকশ্রমিক দিপু ও শিশু আয়েশা গুজব আর মবের বলী: এত এত নৃশংস ঘটনা কিভাবে বলি ?

ইদানিং বাংলাদেশ যেন পরিনত হয়েছে গুজবের দেশে, গজবের দেশে। গুজব সৃষ্টি করে, মব সৃষ্টি করে এখানে সেখানে হত্যা করা হচ্ছে নিরীহ মানুষজনকে। প্রতিদিন এত এত নৃশংস ঘটনা ঘটছে যে কোনটা রেখে কোনটা বলি? এই যেমন, দীপু দাস নামের একটা নিরীহ যুবক হলেন গুজবের বলী। এদিকে, লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতার ৭ বছর বয়সী শিশুকন্যা আয়েশা আক্তারকে নিজের ঘরে পুডিয়ে মারলো একদল সন্ত্রসিী। এটি কেবল দুজন মানুষের মৃত্যু নয়— দিপু চন্দ্র দাস আর আয়েশার হত্যাকাণ্ড যেন আমাদের সমাজের বিবেকের মৃত্যু। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি গুজব, উন্মত্ততা, দায়িত্বহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল। এমন একটি ঘটনা কীভাবে ভাষায় ধরা যায়, কীভাবে বলা যায়—এই প্রশ্নই বারবার ফিরে আসে।

লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের ঘরে তালা লাগিয়ে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ঘুমন্ত অবস্থায় ৭ বছরের শিশু আয়েশা বেগম আগুনে পুড়ে মারা যায়। অগ্নিদগ্ধ হন বিএনপি নেতা বেলাল হোসেন ও তার আরও দুই শিশুকন্যা বীথি আক্তার ও স্মৃতি আক্তার। এর মধ্যে বীথি আক্তার ও স্মৃতি আক্তারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। কত নৃশংস ঘটনা, কল্পনা করতে পারেন পাঠক? নিজেকে ঐ দীপুর জায়গায় আর আয়েশাকে নিজের ছোট মেয়ের সাথে কল্পনা করে একটু চিন্তা করুন। কেমন লাগছে? নিশ্চয় মাথা ঘুরে পড়ে যেতে হচ্ছে?

এদিকে, ভালুকার দিপু চন্দ্র দাস, বয়স মাত্র ২৭। একজন পোশাকশ্রমিক, একজন স্বামী, দেড় বছরের শিশুর বাবা। তার স্বপ্নগুলো ছিল খুব সাধারণ—পরিবারকে একটু ভালো রাখা, সন্তানকে মানুষ করা। অথচ এক বিকেলে কারখানার ভেতরে কাজ করতে করতেই তিনি হয়ে গেলেন ‘অপরাধী’। অভিযোগ—ধর্ম অবমাননা। কী বলেছেন, কোথায় বলেছেন—এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি। ছিল শুধু উত্তেজনা, গুজব আর জনতার হিংস্রতা।

সবচেয়ে ভয়াবহ সত্যটি হলো—দিপুকে হত্যা করেছে শুধু উত্তেজিত জনতা নয়; হত্যা করেছে একটি দায়িত্বহীন ব্যবস্থা। কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করতে পারতেন, নিরাপত্তা দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয় এবং উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। ওই মুহূর্তেই দিপুর জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়।

এরপর যা ঘটেছে, তা সভ্য সমাজে কল্পনাতীত। পিটিয়ে হত্যা, বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে রাখা, শেষে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। কী অপরাধে? কে এই রায় দিল? সন্দেহ কি এখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের যথেষ্ট কারণ?

এই দু‘টি হত্যাকাণ্ডের ভয়ংকর দিক হলো গুজব ও মব সৃষ্টি করে হত্যা। দিপুর ব্যাপারে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর নাম ব্যবহার করে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হয়। যারা নবীজির নাম নিয়ে গুজব তৈরি করে মানুষ হত্যা করে, তাদের সম্পর্কে নবীজি নিজেই কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন—

“যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা কথা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩

অর্থাৎ নবীজির নামে মিথ্যা বলা শুধু অন্যায় নয়, এটি মারাত্মক গুনাহ। দিপুর ঘটনায় সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো—কেউ প্রমাণ করতে পারেনি তিনি কী বলেছেন। তবু নবীজির নাম ব্যবহার করে তাকে হত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এটি নবীপ্রেম নয়; এটি নবীজির শিক্ষার প্রকাশ্য অবমাননা।

রসুল সা. বলেন, ‘সব শোনা কথা (যাচাই-বাছাই করা ছাড়া) বলা কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।‘ (আবু দাউদ ৪৯৯২) আজ সমাজ কিংবা দেশে গুজবের সয়লাব এজন্যই হয়, আমরা যা শুনি তাই বলে বেড়াতে থাকি। রসুল সা. বলেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি, ১. যখন সে মিথ্যা কথা বলে, ২. ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, ৩. আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে।’ (বুখারি ৩৩)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-  ‘আগুন দ্বারা শাস্তি দেয় কেবল আল্লাহ; মানুষের উচিত নয় আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া বা ধ্বংস করা।’ (বুখারি ৩০১৬, মুসলিম ১৭৪৪)

কোরআন গুজব ও সহিংসতার বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—

“হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে দেখো—যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কাউকে ক্ষতি করে না বসো, পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হয়।”
— সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৪৯:৬

এই আয়াত যেন সরাসরি দিপুর ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে। যাচাইহীন গুজব, উত্তেজনা আর তার পরিণতিতে একজন মানুষের প্রাণহানি—এর দায় শুধু হত্যাকারীদের নয়, নীরব দর্শক হয়ে থাকা সমাজেরও।

মানুষ হত্যা সম্পর্কে কোরআনের ঘোষণা আরও ভয়াবহ ও স্পষ্ট—

“যে কেউ একজন মানুষকে হত্যা করল—সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।”
— সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৫:৩২

তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—গুজব ও মব সৃষ্টি করে যারা দিপু ও আয়েশাকে যারা হত্যা করেছে, তারা কি এসব জানত না? নাকি জেনেও উন্মত্ততা, বিদ্বেষ ও গুজবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে?

এই ঘটনার পর কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তদন্ত চলছে। কিন্তু দিপুর দেড় বছরের শিশুসন্তান কি তার বাবাকে ফিরে পাবে? তার স্ত্রী কি এই ক্ষত নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? একটি পরিবার যে আজীবনের জন্য ভেঙে পড়ল, তার দায় কে নেবে?

দিপুর ভাই যখন বলেন, “অপরাধ হলেও বিচার হতো আইনে”—এই কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র ও সমাজের সবচেয়ে কঠিন অভিযোগ। আইন থাকার পরও যদি মানুষ হাতে আইন তুলে নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের অর্থ কী?

এদিকে, লক্ষীপুরে ঘরের বাইরে থেকে তালা দিয়ে ঘুমন্ত একটি পরিবারের সদস্যদের পুড়িয়ে হত্যা করার মতো বর্বরতা মেনে নেয়া যায়না। একটি ৭ বছরের শিশুর আত্মচিৎকারে রাতের আঁধারও হয়তো কেঁদেছে। কিন্তু কেউ শিশুটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারেনি। চব্বিশের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইন্টেরিম সরকার। কিন্তু সরকার চব্বিশের সমর্থকদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।ক্ ঘরের বাইরে থেকে তালা দিয়ে ঘুমন্ত একটি পরিবারের সদস্যদের পুড়িয়ে হত্যা করার মতো বর্বরতা মেনে নেয়া যায়না। একটি শিশুর আত্মচিৎকারে রাতের আঁধারও হয়তো কেঁদেছে। কিন্তু কেউ শিশুটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারেনি। চব্বিশের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইন্টেরিম সরকার। কিন্তু সরকার চব্বিশের সমর্থকদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

এইসব হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে আয়নার মতো চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কি সত্যিই সভ্য? আমরা কি সত্যিই আইনের শাসনে বিশ্বাস করি? নাকি সুযোগ পেলেই উন্মত্ত জনতায় রূপ নিই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজলে, দিপু আর আয়েশার মতো আরও অনেক দিপু আর  আয়েশা আমাদের চারপাশে নীরবে মৃত্যুর দিকে হাঁটতে থাকবে। তাহলে দিনের পর দিন কি আমরা এমন নৃশংস বাংলাদেশ দেখতেই থাকবো?

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫