কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯২ ।। ২৫শে মার্চ: গণহত্যার অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার অনিবার্য উত্থান

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯২ ।। ২৫শে মার্চ: গণহত্যার অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার অনিবার্য উত্থান

উৎসর্গ

“২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতে প্রাণ হারানো নিরীহ মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ ও অজানা অসংখ্য শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।”

২৫শে মার্চ ১৯৭১—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় রাত, যা একই সঙ্গে ধ্বংস ও সৃষ্টির সূচনা বহন করে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই রাতেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। কিন্তু এই বর্বরতাই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথকে আর ফেরার অযোগ্য করে তোলে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায় পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে শুরু হয় টালবাহানা ও ষড়যন্ত্র। ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা পূর্ববাংলার মানুষের ক্ষোভকে বিস্ফোরণে রূপ দেয়। রাস্তায় নেমে আসে জনতা, শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন—যা দ্রুতই একটি কার্যকর বিকল্প শাসনব্যবস্থায় পরিণত হয়।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলেও জাতিকে প্রস্তুত করে দেন। তিনি জানতেন, সময়ের আগে ঘোষণা দিলে তা রক্তক্ষয়ী ও অগোছালো বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে। তাই তিনি কৌশলে জনগণকে সংগঠিত করেন—“প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল”—এই আহ্বান ছিল আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতির স্পষ্ট নির্দেশনা।

অন্যদিকে, পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্চের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও অস্ত্র ঢাকায় আনা হয়। টিক্কা খানকে পূর্ববাংলার সামরিক শাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়—যিনি আগেই নির্মমতার জন্য কুখ্যাত ছিলেন। আলোচনার নামে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় অবস্থান করলেও বাস্তবে তা ছিল সময়ক্ষেপণ; আড়ালে চলছিল গণহত্যার নীলনকশা প্রণয়ন।

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ববাংলায় ভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়—বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া—সবই ছিল স্বাধীনতার মানসিক ঘোষণা। পরিস্থিতি তখন আর নিয়ন্ত্রণে ছিল না; বরং একটি সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

২৫ মার্চ রাত। কারফিউ জারি করে পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ শুরু করে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে সেনানিবাস থেকে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে তারা ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য—কারণ এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের কেন্দ্র। হলগুলোতে ঢুকে ছাত্র-শিক্ষকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হল, জহুরুল হক হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল—সবখানেই চলে হত্যাযজ্ঞ।

একই সময়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ চালানো হয়। সেখানকার পুলিশ সদস্যরা সীমিত অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীর সামনে তারা টিকতে পারেননি। পুরান ঢাকায় ঘরবাড়ি পুড়িয়ে মানুষকে জীবন্ত দগ্ধ করা হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, শুধু সেই রাতেই ঢাকায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর বার্তা দ্রুত ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। গ্রেফতার হওয়ার আগমুহূর্তে দেওয়া এই ঘোষণা জাতিকে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়—এটি আর কোনো আন্দোলন নয়, এটি স্বাধীনতার যুদ্ধ। ২৬শে মার্চ রাতে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান (শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম) দৃপ্ত কণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কালরাতের বিভীষিকা শেষে ২৬ মার্চের ভোর আসে এক নতুন বার্তা নিয়ে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫ মার্চের অন্ধকার আর ২৬ মার্চের আলো এই দুইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের জন্মকথা।

২৫শে মার্চের গণহত্যা ছিল বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস—এই রাতই সেই স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে তোলে। জনগণ বুঝে যায়, সহাবস্থান আর সম্ভব নয়; স্বাধীনতাই একমাত্র পথ।

পরবর্তী নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম, অসীম ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়, তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই রাতেই। ২৫শে মার্চ তাই শুধু একটি হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি নয়; এটি একটি জাতির জেগে ওঠার মুহূর্ত—যেখান থেকে আর ফিরে যাওয়ার পথ ছিল না।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন ২৫ মার্চ, ২০২৬