মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ কলাম

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৩।। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারী—নামহীন উপস্থিতি থেকে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৯৩।। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারী—নামহীন উপস্থিতি থেকে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু

উৎসর্গ

“মুক্তিযুদ্ধের সেই সকল বীরাঙ্গনা ও নির্যাতিত নারী, যাঁদের কণ্ঠ বহুদিন নীরব ছিল, কিন্তু যাঁদের গল্পই আমাদের ইতিহাসকে পূর্ণতা দেয়।”

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু রণাঙ্গনের নয়, এটি মানুষের, স্মৃতির, ত্যাগের এবং বিশেষভাবে নারীর ইতিহাস। অথচ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীরা ছিলেন প্রান্তিক, প্রায় নীরব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অবস্থান বদলেছে—নামহীন উপস্থিতি থেকে তারা উঠে এসেছেন কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে। এই যাত্রা যেমন চলচ্চিত্রের ভাষার পরিবর্তন, তেমনি আমাদের ইতিহাসচর্চারও বিবর্তন।

স্বাধীনতার পরপরই নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে আমরা দেখি এক ধরনের পুরুষকেন্দ্রিক বয়ান। ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২) কিংবা ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩)—এই চলচ্চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, বীরত্ব ও সংগ্রাম তুলে ধরলেও নারীর ভূমিকা সেখানে সীমিত। তারা কখনো মা, কখনো স্ত্রী, কখনো নির্যাতনের শিকার—কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তারা স্বতন্ত্র সত্তা। তাদের উপস্থিতি যেন পুরুষ যোদ্ধার গল্পকে আবেগময় করে তোলার একটি উপাদান মাত্র।

এই সময়ের চলচ্চিত্রে বীরাঙ্গনাদের উপস্থাপন ছিল আরও সীমাবদ্ধ। যৌন সহিংসতার ভয়াবহতা দেখানো হলেও তাদের পরবর্তী জীবন, সামাজিক সংগ্রাম বা পুনর্গঠনের গল্প খুব কমই উঠে এসেছে। ফলে নারীর এক বিশাল অভিজ্ঞতা ইতিহাসের পর্দায় অনুপস্থিতই থেকে গেছে।

এরপর আশি ও নব্বইয়ের দশকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে এই নীরবতার ভেতরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪) চলচ্চিত্রে যুদ্ধকে দেখা হয় একটি পরিবারের ভেতর দিয়ে। এখানে নারী চরিত্র—মা, মেয়ে, বোন—আর অদৃশ্য নয়। তারা দৃশ্যমান, তারা অনুভব করে, ভয় পায়, অপেক্ষা করে। কিন্তু তবুও তারা ইতিহাসের চালক নয়; বরং ইতিহাসের অভিঘাত ধারণকারী।

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে চলচ্চিত্রে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটে। ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫)‘মুক্তির কথা’ (১৯৯৯)—এই দুটি প্রামাণ্যচিত্র নারীর উপস্থিতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। এখানে নারীরা কেবল চরিত্র নন, তারা অংশগ্রহণকারী, তারা সাক্ষ্যদাতা। বিশেষ করে ‘মুক্তির কথা’-তে গ্রামীণ নারীরা নিজেদের ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরেন—যা তাদের ইতিহাসের ‘বিষয়’ থেকে ‘বক্তা’-তে পরিণত করে।

এই ধারাবাহিকতায় ‘মাটির ময়না’ (২০০২) চলচ্চিত্রে আয়েশা চরিত্রের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতায় নারীর অবস্থান ফুটে ওঠে। আবার ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪)-তে নারী চরিত্রগুলো আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা গল্পের কেন্দ্র নয়, কিন্তু গল্পের ভেতরকার মানবিকতা ও সংকটকে গভীর করে তোলে।

২০১০-এর দশকে এসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থিতি একটি বড় রূপান্তর অতিক্রম করে। ‘গেরিলা’ (২০১১) চলচ্চিত্রে বিলকিস বানু চরিত্রটি এই পরিবর্তনের এক শক্তিশালী উদাহরণ। তিনি আর কোনো প্রান্তিক চরিত্র নন; তিনি একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা, যিনি সিদ্ধান্ত নেন, ঝুঁকি নেন এবং লড়াইয়ের ভেতরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একইভাবে ‘রিনা ব্রাউন’ (২০১৭) চলচ্চিত্রে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের নারীর জীবন ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অভিঘাত তুলে ধরা হয়েছে।

হুমায়ূন আহমদ পরিচালিত ‘শ্যামল ছায়া’ (২০০৪) মূলত একটি নৌযাত্রার গল্প, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা একদল সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে দেখা হয়। এই চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রগুলো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেই, কিন্তু তারা যুদ্ধের মানসিক ও মানবিক অভিঘাতের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে।

চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৯৭) চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা আরও তীব্র ও প্রতীকী। এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন মা—যিনি মুক্তিযোদ্ধা ছেলেকে বাঁচাতে নিজের মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানকে শত্রুর হাতে তুলে দেন। এই সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি এক চূড়ান্ত আত্মত্যাগের প্রতীক।

এই চলচ্চিত্রে নারী শুধু সহ্যকারী নন, তিনি সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। তার ভেতরের দ্বন্দ্ব, মাতৃত্বের টানাপোড়েন এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য চরিত্র।
এখানে নারীর ভূমিকা আবেগনির্ভর হলেও তা দুর্বলতার নয়; বরং এক কঠিন, নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের শক্তি।

আশালতা বা অন্যান্য নারী চরিত্রগুলো ভয়, অনিশ্চয়তা, ভালোবাসা ও দায়িত্বের এক জটিল বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে থাকে। তারা পরিবারকে ধরে রাখে, ভেঙে পড়া মানুষকে সাহস দেয়, আবার নিজেরাও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। এখানে নারী কোনো নাটকীয় বীরত্বের প্রতীক নয়; বরং তারা জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রতীক।
এই চলচ্চিত্র আমাদের দেখায়—যুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনে নয়, মানুষের মনোজগতেও সংঘটিত হয়, আর সেই নীরব যুদ্ধের প্রধান বাহক অনেক সময় নারী।

সাম্প্রতিক সময়ে এই ধারা আরও গভীর হয়েছে। ‘রাইজিং সাইলেন্স’ (২০১৯) প্রামাণ্যচিত্রে বীরাঙ্গনাদের কণ্ঠ সামনে এসেছে—যেখানে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা নিজেরাই বলেন। অন্যদিকে ‘১৯৭১: সেই সব দিন’ (২০২৩) চলচ্চিত্রে নারীদের অভিজ্ঞতা ও আবেগকে কেন্দ্র করে গল্প নির্মিত হয়েছে। আর ‘ফাতিমা’ (২০২৪) চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধকালীন এক নারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমকালীন বাস্তবতার সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।

এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কখনোই পূর্ণাঙ্গ নয়, যদি সেখানে নারীর কণ্ঠ অনুপস্থিত থাকে। চলচ্চিত্র সেই অনুপস্থিতিকে ধীরে ধীরে পূরণ করার চেষ্টা করেছে। তবে এই পথচলা সরল নয়; এটি নীরবতা, বিকৃতি, পুনর্ব্যাখ্যা ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

আজকের নির্মাতাদের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—নারীকে কেবল প্রতীক বা আবেগের বাহক হিসেবে নয়, বরং জটিল, বহুমাত্রিক এবং স্বাধীন সত্তা হিসেবে তুলে ধরা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের নয়; এটি সেই নারীরও, যিনি লড়েছেন, সহ্য করেছেন, বেঁচে থেকেছেন এবং স্মৃতিকে বয়ে নিয়ে চলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীর এই বিবর্তন তাই কেবল চলচ্চিত্রের গল্প নয়—এটি একটি জাতির আত্ম-উপলব্ধির গল্প। নীরবতা থেকে উচ্চারণে, প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে—এই যাত্রাই আমাদের বলে দেয়, ইতিহাস একদিন তার সব হারানো কণ্ঠ ফিরে পায়।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২৬ মার্চ, ২০২৬