চলে গেলেন না ফেরার দেশে চিত্রনায়ক ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ

চলে গেলেন না ফেরার দেশে  চিত্রনায়ক ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ

বিনোদন ডেস্ক, ২২ জানুয়ারি: ঢালিউডের আকাশ থেকে খসে পড়ল আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা সিনেমার সোনালি যুগের জনপ্রিয় অভিনেতা ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বুধবার (২১ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার স্ত্রী, চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরী। তিনি জানান, ২১ জানুয়ারি বুধবার সকালে ইলিয়াস জাভেদের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং নিয়মিত চিকিৎসাধীন ছিলেন। একপর্যায়ে বাসায় রেখেই চিকিৎসাসেবা চলছিল, যেখানে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক ও দু’জন নার্স এসে তাকে দেখভাল করতেন। বুধবার সকালে নার্সরা এসে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানান। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পেশোয়ারে জন্মগ্রহণ করেন ইলিয়াস জাভেদ। তার প্রকৃত নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। দেশভাগের পর পরিবারসহ পাঞ্জাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরে চলচ্চিত্রের টানে ঢাকায় আসেন। নৃত্য পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ষাটের দশকে নৃত্য পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন জাভেদ। তার চলচ্চিত্রে প্রথম নৃত্য পরিচালনা ছিল কায়সার পাশার পরিচালনায় উর্দু সিনেমা ‘মালান’ এ।

১৯৬৪ সালে উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র ‘নয়া জিন্দেগি’ দিয়ে নায়ক হিসেবে তার অভিষেক ঘটে। তবে ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পায়েল’ সিনেমায় শাবানার বিপরীতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর একের পর এক সফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন ইলিয়াস জাভেদ।

জাভেদের নৃত্য পরিচালনায় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে রয়েছে অভিনেত্রী শাবানার বাবা ফয়েজ চৌধুরী পরিচালিত ‘মালকা বানু’ সিনেমার সুপারহিট গান ‘মালকা বানুর দেশেরে’, তারপর ‘মনের এ ছোট্ট ঘরে আগুন লেগেছে হায়রে’, ‘চাকভূম চাকভূম চাঁদনী রাতে’সহ আরও কয়েকটি।

জাভেদ অভিনীত আলোচিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘মালকা বানু’, ‘অনেক দিন আগে’, ‘শাহজাদী’, ‘নিশান’, ‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নরম গরম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘আজো ভুলিনি’, ‘চোরের রাজা’ ও ‘জালিম রাজকন্যা’ সহ আরও কিছু।

অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ও সৃজনশীল নৃত্য পরিচালক। নাচের নতুন ভঙ্গি ও ফিউশন স্টাইল দিয়ে তিনি সেই সময়ের বাংলা সিনেমায় আলাদা মাত্রা যোগ করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নিশান’, যা আজও দর্শকদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে। এই ছবিতে তাঁর জাতীয় পুরস্কার পাবার কথা থাকলেও তিনি পাকিস্তানী নায়ক বলে সেই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হন। সারাজীবন প্রায় দুশো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে এবং ততোধিক ছবিতে নৃত্য পরিচালনা করেও কোন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার না পাবার বেদনা নিয়ে চলেই গেলেন নায়ক জাবেদ। একই বেদনা নিয়ে চলে গেছেন নায়ক ওয়াসিমও।

আফগানিস্তানের পেশোয়ারে ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন জাবেদ। পরে সেখান থেকে পাঞ্জাবে আসে তার পরিবার। ১৯৬৩ সালে পাঞ্জাবে ছেড়ে বাংলাদেশে আসেন তারা। তাঁর পুরো নাম ছিল রাজা ইলিয়াস জাবেদ। নাচ ও অভিনয় না করতে তাঁর বাবা নিষেধ করেছিলেন। বাবা বলেছিলেন, হয় নাচ ও সিনেমা ছাড়তে হবে, নইলে বাড়ি ছাড়তে হবে। কিন্তু সেই তরুণ বয়সে জাবেদ নিজ বাড়ি ছেড়েই পুরাপুরি চলে এসেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায়। এরপর জীবনে আর বাবার সাথে দেখা হয়নি। একদিন ফোনে আলাপ হয়েছিল আর মায়ের সাথে দুদিন মাত্র। কিন্তু তখনো বাবা তাকে ক্শমা করেননি বলে জাবেদ তাঁর এক টিভি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন। ব্যক্তিজীবনে ১৯৮৪ সালে চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীকে বিয়ে করেন ইলিয়াস জাভেদ। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে সুখ-দুঃখের নানা অধ্যায় পেরিয়ে জীবনের শেষ সময়টিতে স্ত্রীই ছিলেন তার প্রধান অবলম্বন। তাঁদের কোন সন্তান ছিল না। আজীবন জাবেদ স্ত্রী ডলিকে নিয়েই মেতে ছিলেন তবুও । আর ডলিও জাবেদকে শিশুর মতোই ভালবাসতেন।

তার মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্ত, সহকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীরা এই কিংবদন্তি অভিনেতার প্রয়াণে শোক ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।

বরেণ্যে এই তারকার মৃত্যুতে শোকের ছাঁয়া নেমেছে এসেছে শোবিজ অঙ্গনে। চলচ্চিত্রের দীর্ঘদিনের বন্ধু অভিনেতা ও নৃত্য পরিচালক ইলিয়াস জাভেদের প্রস্থানে ‘ভেঙে পড়েছেন’ অভিনেতা ও প্রযোজক-পরিচালক মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা। এক সময়ের সহশিল্পীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে এই অভিনেতা বলেন, “জাভেদ খুব ভালো মানুষ ছিল, আমার অনেক সিনেমায় সে কাজ করেছে। আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আমার অনেক সিনেমাতে কাজ করেছে। আমি তাকে ছাড়া সেসময় অন্য কাউকে চিন্তা করতে পারতাম না।"

সোহেল রানার কথায়, ভিনদেশে জন্ম হলেও বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা আঁকড়ে ধরে এই দেশে থেকে গিয়েছিলেন অভিনেতা জাভেদ। "জাভেদ বাংলাদেশের মানুষ ছিল না, ও ছিল পাকিস্তানের। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ ছেড়ে যায়নি, বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গিয়েছিল। তার মধ্যে দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল। গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে বাংলাদেশের যত নৃত্য পরিচালক তৈরি হয়েছে তাদের সবার ওস্তাদ জাভেদ। তাকে আসলে আমাদের চলচ্চিত্রে মনে রাখা উচিত।" দীর্ঘদিন একে অপরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি সোহেল রানা ও জাভেদের। সেই আক্ষেপ ঝরেছে সোহেল রানার কথায়। তিনি বলেন, "আমি নিজেও অসুস্থ ছিলাম তো সেজন্য জাভেদের বাসায় যাওয়া হয়নি। আমাদের দীর্ঘদিন দেখা হয়নি, মাঝে মধ্যে ফোনে কথা হত। তাকে হারিয়ে ফেলা আমার জন্য কষ্টের।"

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও অভিনেতা মিশা সওদাগর। তিনি বলেন, “জাভেদ ভাই দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। হাসপাতাল ও বাসায় যাওয়া আসার মধ্যেই ছিলেন। বাসাতেই নার্স রেখে চিকিৎসা চলছিল, সকালে অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি মারা গেছেন। খবরটি শুনে ভাবীকে (অভিনেত্রী ডলি চৌধুরী) কল করি, ভাবী কাঁদতে কাঁদতে বলছেন, ‘তোমার ভাই তো আর নাই। হাসপাতালে যাচ্ছি আমরা’।”

ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ নায়ক শাকিব খান ইলিয়াস জাভেদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি শোক প্রকাশ করে লিখেন, “তাঁর প্রয়াণে আমরা হারালাম শুধু একজন শিল্পীকে নয়, হারালাম একজন অভিভাবকতুল্য মানুষকেও।” দেশ সেরা এই নায়ক প্রত্যাশা জানিয়ে লিখেন,“জাভেদ ভাই আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেও পর্দায় ও শিল্পাঙ্গনে রেখে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি ও অবদান, যা তাঁকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম ও অনুপ্রেরণা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

চিত্রনায়ক ইলিয়াস জাভেদের প্রথম নামাজে জানাজা হয়েছে উত্তরা ১২ সেক্টর কবরস্থান মসজিদে। বাদ আসর এফডিসিতে ২য় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সন্ধ্যায় উত্তরার ১২ নাম্বার সেক্টর কবরস্থান মসজিদে দাফন করা হবে সত্তর আশির দশকের জনপ্রিয় এই চিত্রানায়ককে।

ইলিয়াস জাভেদের বিদায়ে কেবল একজন অভিনেতার নয়, বরং বাংলা সিনেমার ফোক-ফ্যান্টাসি ও বর্ণাঢ্য এক যুগের অবসান হলো। রুপালি পর্দায় তার উপস্থিতি, নাচের ছন্দ ও নায়কোচিত অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।