একটি অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান

আলেমের ঘরে জালেম হয়ে জন্মেছিলাম…জহির রায়হান

আলেমের ঘরে জালেম হয়ে জন্মেছিলাম…জহির রায়হান

 (নিচের এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে, আন্‌ওয়ার আহমদ সম্পাদিত ‘রূপম: একটি অনুপম সংকলন’ সাহিত্যপত্রে। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও পরে চলচ্চিত্র পরিচালক এফ কবীর চৌধুরী।)

ভয়েস অব পিপল বিনোদন ডেস্ক, ৩১ জানুয়ারি: 

জনাব জহির রায়হানও মূলত সাহিত্যিক। সাহিত্যিকদের ভাষা যে প্রাণের ভাষা, মনের ভাষা। আর ছায়াছবি তো মানুষের মনে দোলা জাগিয়ে অনুভূতিপ্রবণ করে তোলার একটি বড় মাধ্যম।

‘তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। একটা “ফাংশন” উপলক্ষে দাওয়াত করতে গেছি সাহিত্যিক ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ সাহেবকে। বিশ্ববিদ্যালয়েরই “ফাংশন”। ওই সময়েই চিত্রপরিচালক জনাব কারদারের (কিংবদন্তিতুল্য পরিচালক এ জে কারদার) সঙ্গে আমাকে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন। কথায় কথায় উনি আমাকে চিত্রপরিচালনায় আসার কথা বললেন। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। পূর্ব পাকিস্তানের নির্মিত ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা‘তে পরিচালকের সহকারী হয়ে কাজ শুরু করলাম। এটা ১৯৫৭ সনের কথা। তারপর সালাউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে ‘যে নদী মরুপথে‘তে সহপরিচালকের ভূমিকা গ্রহণ করি। বইটির চিত্রনাট্যও আমি তৈরি করেছিলাম। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেষ পরীক্ষায় পাস করে ১৯৬১ সনে ‘কখনো আসেনি‘ চলচ্চিত্রটি নিজস্ব পরিচালনায় শেষ করি।’

ওপরের কথাগুলো বললেন আজকের সবচেয়ে ব্যস্ত জনপ্রিয় পরিচালক জনাব জহির রায়হান সাহেব।

আপনার চিত্রপরিচালনার পূর্ববৃত্ত তো শুনলাম। কিন্তু আপনি যে চিত্রপরিচালক হবেন, এ কথা আগে থেকেই ভাবতেন?

: মোটেই না। আশা ছিল একজন ক্যামেরাম্যান হব। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই কলকাতায় প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফিকে ভর্তি হই এবং কিছুদিন পড়ালেখা করার পর ছেড়ে দিই।

: কলকাতায় ছিলেন তাহলে এর আগে?

: হ্যাঁ। কলকাতার কথা মনে হলেই মনে পড়ে বাবার কথা।

: আপনার বাবা?

: হ্যাঁ। আল্লামা কায়সার। বড় দ্বীনদার লোক ছিলেন তিনি। কলেজে শিক্ষকতা করতেন। আর আমার ধারণা ছিল, লেখাপড়া করে আমিও শিক্ষকতার ব্রতকে গ্রহণ করব। কিন্তু হলো না। আলেমের ঘরে জালেম হয়ে জন্মেছিলাম…

: আরে না না। কী যে কন! আপনারাই তো আজকের দিনে সত্যিকার গুণী লোক। অগণিত দর্শকের কণ্ঠে কণ্ঠে আপনাদের চিত্রপরিচালনার সুখ্যাতি।

: সে যাহোক, নিজের অজান্তেই চিত্রাঙ্গনে এসে পা রাখলাম। জানি না ভবিতব্য কোন দিকে নিয়ে যাবে।

: আচ্ছা আপনি তো ভালো সাহিত্য করতেন, ইদানীং তা ছেড়ে দিলেন কেন?

: না, ছেড়ে দিইনি, কাজের চাপে পেরে উঠছিনে, এই যা। নইলে ছবিতে হাত দেওয়ার আগে পত্রিকা সম্পাদনার কাজও তো শুরু করেছিলাম। এ দেশে আমিই প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করি। পত্রিকাটির নাম ছিল ‘সাপ্তাহিক প্রবাহ‘

: নিজস্ব পরিচালনায় কটি ছবি আপনার মুক্তি পেয়েছে?

: হিসেব করুন না—কখনো আসেনি, সোনার কাজল, কাঁচের দেয়াল, সংগম (প্রথম উর্দু ও রঙিন), বাহানা (প্রথম সিনেমাস্কোপ), বেহুলা, আনোয়ারা। তা ছাড়া সামনে খান দুই একই সঙ্গে শুরু করছি। শুনেছেন বোধ হয় ‘লেট দেয়ার বি লাইট‘ ইংরেজিতে করছি। এর থেকে সুবিধামতো আরও পাঁচ–ছয় ভাষায় ডাবিং করব। অন্য আরেকটি বই উর্দুতে করছি।

জহির রায়হান সাহেবের দুই ভাই কলেজে পড়ছেন, এক ভাই তাঁর সঙ্গে চিত্রজগতেই যুক্ত, অন্য আরেক ভাই সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার। সংবাদ–এর যুগ্ম সম্পাদকের কাজ করছেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে যথেষ্ট নাম কিনেছেন তিনি।

জনাব জহির রায়হানও মূলত সাহিত্যিক। সাহিত্যিকদের ভাষা যে প্রাণের ভাষা, মনের ভাষা। আর ছায়াছবি তো মানুষের মনে দোলা জাগিয়ে অনুভূতিপ্রবণ করে তোলার একটি বড় মাধ্যম। তাই তিনি চেষ্টা করেন তাঁদের প্রাণের ভাষায় কথা বলার জন্য। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। আমরা এই উপাদানকে ছবি তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারি। তাতে নতুনত্ব থাকবে, মানুষ খুঁজেও পাবে অনেক কিছু। কিন্তু সে কয়জন মানুষ? ওই ধরনের অনুভূতিশীল ছবি কয়জন লোকে দেখবে?

আমরা কি ছবি করার কলাকৌশল অন্যান্য দেশের থেকে কম জানি বা আমাদের ছবির অন্যান্য দেশের ছবি থেকে মান কোনো দিকে অনুন্নত? মোটেই না। বরং এই এগারো বছরে আমাদের দেশে যা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে উন্নত হয়েছে, সেই তুলনায়—আমাদের বাংলারই অন্য একটি অংশ তার বিশ বছর লেগেছে।

সে যাহোক, সুযোগ এবং সময় এলে আমরা তার সদ্ব্যবহার করব।’