ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৩ ।। দেশে আইনের শাসনের জায়গা যখন জনতার হাতে
উৎসর্গ:
আইনের হাতে বিচার চাওয়া প্রতিটি নাগরিকের প্রতি।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার সংকটকে এখন আর শুধু চুরি, ছিনতাই, হত্যা কিংবা অপরাধ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যাবে না। সংকটটি আরও গভীরে। মানুষের একটি অংশ যখন পুলিশের ওপর হামলা করে, আসামি ছিনিয়ে নেয় কিংবা অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই কাউকে গণপিটুনি দেয়, তখন বুঝতে হবে—রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার জায়গায় বড় ধরনের ফাটল তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ওপর হামলার পরিসংখ্যানটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই—এই ছয় মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৩১৭টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে এমন মামলা ছিল ২৭৫টি। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৪২টি, প্রায় ১৫ শতাংশ।
সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। এর প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধিকে তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনা। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, হামলার ঘটনা এখন শুধু বড় কোনো অভিযানের সময় ঘটছে না; গ্রেপ্তার, আসামি ধরতে যাওয়া কিংবা স্থানীয় কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করেও সংঘবদ্ধ মানুষ পুলিশের ওপর চড়াও হচ্ছে।
এখানেই ‘মব সংস্কৃতি’র ভয়াবহতা।
মব সংস্কৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি মানুষকে বিচারক, জুরি এবং শাস্তিদাতা—তিন ভূমিকাতেই দাঁড় করিয়ে দেয়। একজনকে চোর সন্দেহ হয়েছে, কেউ গুজব ছড়িয়েছে, কারও বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে কিংবা কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ হয়েছে—অমনি একদল মানুষ তাকে ঘিরে ফেলছে। তদন্ত নেই, প্রমাণ নেই, আদালত নেই। কয়েক মিনিটের উত্তেজনাই হয়ে উঠছে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যও বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গণপিটুনিতে ২১ জন নিহত হন। আগের মাসে নিহতের সংখ্যা ছিল ১০। অর্থাৎ এক মাসে প্রাণহানি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছিল। মার্চে গণপিটুনিতে নিহত হন ১৯ জন, এপ্রিলে ২১ জন এবং মে মাসে ৩২ জন। শুধু মে মাসেই আহত হন আরও ৭১ জন।
জুলাই মাসের হিসাব আরও চিন্তার। ওই মাসে ৬৬টি গণপিটুনির ঘটনায় ৩১ জন নিহত ও ৫৮ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ শুধু সাত মাসেই গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। এই প্রবণতা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন আইনের পরিবর্তে নিজের হাতে বিচার তুলে নিচ্ছে?
এর একটি কারণ অবশ্যই পুলিশের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা। বিশেষ করে গত দেড় দশকে রাজনৈতিক ব্যবহার, বিরোধীদের দমন, হয়রানি, মামলা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ পুলিশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে সমাজের একটি অংশের চোখে পুলিশ আর নিরপেক্ষ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আগের মতো গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু এখানেই আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে।
পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে পুলিশ সংস্কার করতে হবে; পুলিশকে পিটিয়ে সেই অভিযোগের বিচার করা যাবে না।

একজন পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে, মামলা হবে, বিচার হবে। একইভাবে কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু জনগণ যদি অভিযোগের ভিত্তিতে রাস্তায় কাউকে হত্যা করার অধিকার নিজেদের হাতে তুলে নেয়, তাহলে সেটি ন্যায়বিচার নয়—এটি আরেকটি অপরাধ।
রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ তাই শুধু পুলিশকে পোশাক বদলে দেওয়া বা নতুন স্লোগান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন পুলিশের আচরণে পরিবর্তন, তদন্তে পেশাদারিত্ব, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সর্বোপরি জবাবদিহি।
একই সঙ্গে পুলিশের সক্ষমতার প্রশ্নটিও সামনে আনতে হবে।
দেশে পুলিশের সংখ্যা গত দেড় দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জনবল বাড়লেই কার্যকর পুলিশিং নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত যানবাহন, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, তদন্ত সরঞ্জাম, আবাসন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ।
প্রায় আড়াই লাখ পুলিশ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ আবাসন সুবিধা পান—এই তথ্যটি যদি সঠিক হয়, তাহলে এটি বাহিনীর কর্মপরিবেশ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে একজন পুলিশ সদস্য যদি যথাযথ বিশ্রাম ও আবাসন সুবিধা না পান, তাহলে তার পেশাগত দক্ষতা ও মানসিক সক্ষমতার ওপরও এর প্রভাব পড়বে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা। পর্যাপ্ত টহল গাড়ি না থাকলে অপরাধ সংঘটনের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি করবে। সেই সুযোগে অপরাধী পালাবে। পরে মানুষ বলবে—পুলিশ কোথায় ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু পুলিশের ব্যর্থতায় খুঁজলে চলবে না; রাষ্ট্র পুলিশকে কী ধরনের সক্ষমতা দিয়েছে, সেই প্রশ্নও করতে হবে।
তবে পুলিশের দুর্বলতার অজুহাতে মব সংস্কৃতিকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
বরং পরিস্থিতি যত কঠিন হবে, আইন প্রয়োগের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তত শক্তিশালী করতে হবে।
এখানে কমিউনিটি পুলিশিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে ভুল বোঝাবুঝি কমে। স্থানীয় শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে পুলিশের নিয়মিত যোগাযোগ তৈরি করা দরকার। কোনো ঘটনা ঘটার পর পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবে—এমন ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; ঘটনা ঘটার আগেই সমাজের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
গুজব মোকাবিলাও এখন আইনশৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিথ্যা তথ্য কয়েক মিনিটে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একটি গুজব কখনো কখনো একজন মানুষের জীবনও কেড়ে নিতে পারে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য যাচাই এবং সত্য তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে গণপিটুনির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মানুষ যদি দেখে, জনতার হাতে মানুষ মরছে কিন্তু হত্যাকারীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে, তাহলে মব সংস্কৃতি আরও সাহসী হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র নয়, আইনের প্রতি মানুষের আস্থা।
পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে পুলিশকে জনগণের বন্ধু হওয়ার কথা শুধু বলতে হবে না—বাস্তবে তার প্রমাণ দিতে হবে। আবার জনগণকেও বুঝতে হবে, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করতে হয়। রাস্তায় বিচার প্রতিষ্ঠা করলে শেষ পর্যন্ত নিরপরাধ মানুষও সেই বিচারের শিকার হতে পারে।
আজ যে জনতা একজন সন্দেহভাজনকে পিটিয়ে হত্যা করছে, কাল সেই একই জনতা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অন্য কাউকে ঘিরে ফেলতে পারে। কারণ মবের কোনো নিরপেক্ষতা নেই; তার কোনো তদন্ত নেই; তার কোনো বিচারবোধ নেই। আছে শুধু মুহূর্তের উত্তেজনা।
তাই বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি শুধু অপরাধ দমন নয়, আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনর্গঠন করা।
পুলিশকে শক্তিশালী করতে হবে, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে নয়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কিন্তু জনগণের হাতে বিচার তুলে দেওয়ার সুযোগ দিয়ে নয়। অপরাধীর বিচার করতে হবে, কিন্তু অভিযোগকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ধরে নিয়ে নয়।
কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ, যখন একজন সাধারণ মানুষ যেমন পুলিশের কাছ থেকে নিরাপত্তা পায়, তেমনি পুলিশও দায়িত্ব পালনের সময় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিরাপত্তা পায়।
আইনের শাসন দুর্বল হলে মব শক্তিশালী হয়। আর মব শক্তিশালী হলে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না কেউই।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৩ আগস্ট, ২০২৬