কলিকালের কলধ্বনি ।। ৮১ ।। প্রাসাদবন্দি রাষ্ট্রপতি: নীরব অপমান থেকে সাংবিধানিক প্রশ্ন
উৎসর্গ
“গণতান্ত্রিক শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানে বিশ্বাসী নাগরিকসমাজের প্রতি।”

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংঘাত, অভ্যুত্থান, অচলাবস্থা—এসব নতুন নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান নিজ বাসভবনে বসে যদি নিজেকে কার্যত অবরুদ্ধ, অকার্যকর ও অপমানিত বলে বর্ণনা করেন—তবে সেটি নিছক রাজনৈতিক টানাপোড়েন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের গভীর সংকেত। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাম্প্রতিক ‘দৈনিক কালের কন্ঠে’র সাক্ষাৎকার সেই সংকেতকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
এই ঘটনাকে আবেগ দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। রাষ্ট্রপতি যে দল থেকেই নিয়োগপ্রাপ্ত হন না কেন-তিনি দেশের এক নম্বর ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি একটি দেশের প্রধান ব্যক্তি ও প্রতিক। এটিকে দেখতে হবে প্রতিষ্ঠান বনাম প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক, প্রতীকের রাজনীতি এবং সাংবিধানিক শালীনতার মানদণ্ডে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অর্থাৎ তাঁর ক্ষমতার সূচনা হয়েছিল রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে। তিনি নিজেও বলেছেন, তিনি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা একবারও বঙ্গভবনে যাননি, সরাসরি যোগাযোগ রাখেননি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁকে অবহিত করেননি। প্রশ্ন হলো—শপথের মাধ্যমে বৈধতা অর্জন করে পরে সেই উৎসকেই উপেক্ষা করা কি সাংবিধানিক সৌজন্যের পরিপন্থী নয়?
গণতন্ত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠানগত শালীনতা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার সম্পর্ক যদি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবু সেটি থাকা জরুরি। সম্পূর্ণ নীরবতা একধরনের প্রতীকী বার্তা বহন করে—এবং সেই বার্তা ছিল বিচ্ছিন্নতার।
রাষ্ট্রপতি দাবি করেছেন, তাঁকে অসাংবিধানিকভাবে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। বঙ্গভবন ঘেরাও, পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপ—এসব তিনি দেখেছেন সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির প্রয়াস হিসেবে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তাঁর স্থানে বসানোর চেষ্টা হয়েছিল, যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাজি হননি। এই অভিযোগ প্রমাণের বিষয়; তবে অভিযোগটির রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ এটি দেখায়, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদকেও আলোচ্য ও প্রতিস্থাপনযোগ্য করে তোলা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্যে একটি বাক্য গুরুত্বপূর্ণ: “আমার রক্ত ঝরে যাবে, কিন্তু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব।” এই উচ্চারণে ব্যক্তিগত নাটকীয়তা থাকলেও, এর ভেতরে রয়েছে এক প্রতীকী অবস্থান—তিনি নিজেকে ধারাবাহিকতার শেষ প্রহরী হিসেবে দেখেছেন।
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ—তাঁর বিদেশ সফর আটকে দেওয়া হয়েছে। কসোভো, কাতারের সামিট—কোথাও যেতে দেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও বাধা এসেছে। এমনকি ঈদের নামাজেও তাঁকে নাকি যেতে দেওয়া হয়নি!
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টা দেড় বছরে বহুবার বিদেশ সফরে গেছেন, প্রতিনিধিদল নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে—রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলে দেশের সাংবিধানিক প্রধানকে অদৃশ্য রেখে প্রধান উপদেষ্টার একক উপস্থিতি কি ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়নি?
রাষ্ট্রপতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতীকীভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁকে নিষ্ক্রিয় রাখা মানে কূটনৈতিক কাঠামোয় একমুখী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এটি আইনসঙ্গত হতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এটি কি সাংবিধানিক ভারসাম্যের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগ হলো তাঁকে জনসমক্ষে অদৃশ্য করে দেওয়া। প্রেস উইং প্রত্যাহার, জাতীয় দিবসে বাণী প্রকাশ বন্ধ, বিদেশে তাঁর ছবি সরিয়ে দেওয়া, সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর প্রেস টিম সরিয়ে নেওয়া—এসব ঘটনা তাঁকে কার্যত যোগাযোগবিহীন করে দেয়।
একজন রাষ্ট্রপতি যদি নিজের কার্যালয় থেকে অভিনন্দন বার্তাও দিতে না পারেন, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়; এটি ক্ষমতার দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণের কৌশল।
আধুনিক রাজনীতিতে প্রতীকই বাস্তবতা নির্মাণ করে। কার ছবি থাকবে, কার বক্তব্য ছাপা হবে—এসবই জনমনে বৈধতার ধারণা তৈরি করে। রাষ্ট্রপতিকে সেই পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া মানে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতিকে সংকুচিত করা।
এখন যখন প্রধান উপদেষ্টা আর ক্ষমতায় নেই, প্রশ্ন উঠেছে—এসব ঘটনার বিচার হবে কি? যদি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা কি আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য?
আইন সাধারণত স্পষ্ট লঙ্ঘন বিচার করে। কিন্তু নীরব উপেক্ষা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বা প্রতীকের সংকোচন—এসব কি আইনি ভাষায় অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব? হয়তো কঠিন। তবে সাংবিধানিক রীতিনীতির লঙ্ঘন সবসময় দণ্ডবিধির আওতায় পড়ে না, তবু তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষতি করে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি নৈতিক। রাষ্ট্রপতি দেশের এক নম্বর নাগরিক। তাঁর প্রতি আচরণ কি কেবল ব্যক্তিগত অসম্মান, নাকি রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা?
যদি সত্যিই তাঁকে অকার্যকর, অদৃশ্য ও বিচ্ছিন্ন রাখা হয়ে থাকে, তবে সেটি কেবল এক ব্যক্তির ক্ষোভ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতীকের সংকোচন। গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির ঊর্ধ্বে। তাই ব্যক্তির প্রতি আচরণ আসলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আচরণ।
“প্রাসাদবন্দি রাষ্ট্রপতি” কেবল একটি নাটকীয় উপমা নয়; এটি ক্ষমতার সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। দেড় বছরের এই সময়কাল দেখিয়েছে—সংবিধানের অক্ষরে ক্ষমতার সীমা নির্ধারিত হলেও, বাস্তবে ক্ষমতার প্রয়োগ অনেকটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল।
শপথের মাধ্যমে শুরু হওয়া বৈধতা যদি পারস্পরিক সম্মানে রূপ না নেয়, তবে তা নীরব সংঘাতে পরিণত হয়। সেই সংঘাতের শব্দ বাইরে শোনা যায় না, কিন্তু তার অভিঘাত রাষ্ট্রের ভেতরে জমা থাকে।
আজ প্রশ্নটি ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কেমন সাংবিধানিক সংস্কৃতি চাই? যেখানে মতভেদ থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে, নাকি যেখানে ক্ষমতার প্রয়োজনে প্রতীকগুলোকে অদৃশ্য করে দেওয়া হবে?
ইতিহাস হয়তো নিরপেক্ষ বিচার করবে। কিন্তু তার আগেই আমাদের ভাবতে হবে—নীরব অপমান কি কেবল একটি অধ্যায়, নাকি ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত?
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও অধ্যাপক
লন্ডন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬