এসেক্স সৈকতে শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষক ও তাঁর কিশোরী কন্যা

এসেক্স সৈকতে শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষক ও তাঁর কিশোরী কন্যা

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ২৪ জুলাই: 

যুক্তরাজ্যের এসেক্সের ওয়েস্ট মার্সি সমুদ্রসৈকতে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক শিক্ষক এবং তাঁর ১৫ বছর বয়সী কন্যা। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গুরুতর আহত শিশুটি বর্তমানে লন্ডনের একটি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ঘটনাটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।

পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কোলচেস্টারের কাছে ওয়েস্ট মার্সির সিভিউ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন সৈকতে দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহতরা হলেন শেলিনা রহমান (৪২) এবং তাঁর মেয়ে সামিহা রহমান (১৫)। দুজনেই পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা।

গ্রীষ্মের আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয় শোকে

পরিবারের প্রায় ১০ সদস্য গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে একদিনের ভ্রমণে ওয়েস্ট মার্সি সমুদ্রসৈকতে গিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৈকতের একটি বালুচরে (স্যান্ডব্যাংক) খেলাধুলার সময় দ্রুত জোয়ার আসতে শুরু করে। প্রবল জোয়ারে পায়ের নিচের বালু সরে গেলে কয়েকজন পানিতে পড়ে যান।

এ সময় পরিবারের সাত বছর বয়সী এক শিশু স্রোতের মধ্যে আটকা পড়ে। তাকে উদ্ধার করতে প্রথমে পরিবারের কয়েকজন সদস্য এগিয়ে যান। পরে শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে পানিতে নামেন শেলিনা রহমান ও তাঁর মেয়ে সামিহা রহমান। কিন্তু প্রবল স্রোত ও দ্রুত বাড়তে থাকা জোয়ারে তাঁরা নিজেরাই পানিতে তলিয়ে যান।

পুলিশের ধারণা, শিশুটিকে উদ্ধার করার চেষ্টাই মা ও মেয়ের মৃত্যুর প্রধান কারণ।

শিশুটি লাইফ সাপোর্টে

এসেক্স পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া সাত বছর বয়সী শিশুটি নিহতদেরই আত্মীয়। তাকে গুরুতর অবস্থায় লন্ডনের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে সে বর্তমানে লাইফ সাপোর্টে রয়েছে।

ঘটনায় আহত আরও কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

শিক্ষক ছিলেন শেলিনা রহমান

পরিবার জানিয়েছে, শেলিনা রহমান পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। তাঁর স্বামী ডা. মনসুর রহমান, যিনি যুক্তরাজ্যে বিএনপির অঙ্গসংগঠন যুবদল ইউকের সভাপতি। শালিনার বাবা মুজিবুর রহমান যুক্তরাজ্যে বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, কয়েক মিনিট আগেও সবাই আনন্দে সময় কাটাচ্ছিলেন। কেউ কল্পনাও করতে পারেননি যে একটি পারিবারিক ভ্রমণ এমন ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে পরিণত হবে।

"আমরা বাকরুদ্ধ"

শেলিনা রহমানের ভাশুর মাতিউর রহমান বিবিসিকে বলেন, "আমরা সবাই বাকরুদ্ধ। চার ভাই, এক বোন—পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ। তারা সমুদ্রের পাশে খেলছিল। হঠাৎ বড় একটি ঢেউ আসে। তারপরই সবকিছু শেষ হয়ে যায়।"

পরিবারের বন্ধু মিছবা উদ্দিন জানান, নিহত মা ও মেয়ে খুব ভালো সাঁতার জানতেন না। তারপরও শিশুটিকে বাঁচাতে তাঁরা এক মুহূর্ত দ্বিধা করেননি।

তিনি বলেন, "তারা খুব সাধারণ, পরিশ্রমী একটি পরিবার। শুধু একদিনের আনন্দভ্রমণে এসেছিল। আজ পুরো কমিউনিটি শোকে ডুবে আছে।"

কয়েক মিনিটের মধ্যে শুরু হয় বিশাল উদ্ধার অভিযান

বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে জরুরি কল পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসে কোস্টগার্ড, এসেক্স পুলিশ, দমকল, বিশেষ উদ্ধারকারী দল, দুটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং ইস্ট অব ইংল্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্থানীয় কয়েকজন সাহসী মানুষ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পাশের একটি ক্যাফের তিন কিশোরী কর্মীও প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবাকর্মীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন।

দীর্ঘ চেষ্টার পরও শেলিনা রহমান ও সামিহাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

পুলিশের তদন্ত

এসেক্স পুলিশের ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর আল পিচার বলেন,

"মা ও মেয়ের মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা বিশ্বাস করি, তারা সাত বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন। ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত সবাই একই পরিবারের সদস্য। কীভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা জানতে আমরা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করছি।"

পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত কারও কাছে ছবি বা ভিডিও থাকলে তা তদন্তের স্বার্থে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

জোয়ারের ফাঁদ

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওয়েস্ট মার্সির সৈকতে জোয়ার খুব দ্রুত আসে। অনেক সময় মানুষ বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে বুঝতেই পারেন না যে কয়েক মিনিটের মধ্যে চারদিক পানি ঘিরে ফেলতে পারে। স্থানীয়দের ভাষায়, "এখানে জোয়ারকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।"

যদিও স্থানীয় এমপি বার্নার্ড জেনকিন বলেছেন, ওয়েস্ট মার্সিকে সাধারণত বিপজ্জনক সৈকত হিসেবে ধরা হয় না, তবে এ এলাকায় প্রবল স্রোত ও দ্রুত জোয়ারের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত।

ন্যাশনাল ওয়াটার সেফটি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাজ্যে খোলা জলাশয়ে অন্তত ২৯ জনের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হয়েছে।

শোকের ছায়া ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে

পূর্ব লন্ডন, বার্কিং এবং ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শেলিনা রহমান ও সামিহার মৃত্যুতে গভীর শোক নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করছেন।

একটি সাধারণ পারিবারিক আনন্দভ্রমণ যে কয়েক মিনিটের মধ্যে দুই প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, এসেক্সের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও সেই কঠিন বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র যতই শান্ত মনে হোক না কেন, জোয়ার-ভাটা ও স্রোতের আচরণ সম্পর্কে সচেতন না হলে মুহূর্তেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর শোক

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গ্রীষ্মকালে খোলা জলাশয় ও সমুদ্রে সাঁতার কাটার ঝুঁকি সম্পর্কে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে তিনি উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া জরুরি সেবাকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।

সতর্কবার্তা

ওয়েস্ট মার্সির সৈকত

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়েস্ট মার্সির সৈকতে জোয়ারের পানি খুব দ্রুত বাড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে বালুচর পানির নিচে চলে যায়। ফলে অভিজ্ঞতা ছাড়া সেখানে নামা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সমুদ্রে নামার আগে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি দেখে নেওয়া, শিশুদের একা পানিতে না নামানো এবং বিপদে কাউকে উদ্ধার করতে গেলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক গভীর শোকের স্মারক হয়ে থাকবে। শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে মা ও মেয়ের আত্মত্যাগ বহু মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে।