নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২২ ।। দৌলত মিয়ার দানখয়রাত

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২২ ।। দৌলত মিয়ার দানখয়রাত

।। দৌলত মিয়ার দানখয়রাত ।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ

যাঁরা ধর্ম  আর কুসংস্কারের পার্থক্য বুঝে

পাগলা মসজিদে জুন মাসে দান উঠেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা

দৌলত মিয়া গ্রামের পরিচিত দৌলতবান মানুষ। ব্যবসায় তাঁর ভালো আয় আছে। মানুষ তাঁকে সম্মান করে, কারণ তিনি দান-খয়রাত করেন। খুবই মাজার ভক্ত তিনি। এমনকি কোন গরম মাজারের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাবার সময় তিনি গাড়ির গতি কমিয়ে দেন। তারপর নেমে দান বাক্সে কিছু টাকা পয়সা দান করে দিয়ে পেছন ফিরে আবার গাড়িতে উঠেন। তার ধারণা জোরে গাড়ি চালালে ঐ দরবেশের বদ দোয়ায় হয়তো একসিডেন্ট হয়ে যেতে পারে। এসব নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে তার সোজা জবাব, এসব বাপ দাদার কাছ থেকে তিনি শিখেছেন। এলাকার অনেকে বলে, অঢেল দৌলতের মালিক দৌলত মিয়ার নামটি তার সঙ্গে খুবই মানায়। তবে তাঁর দানের ধরন এবং বিশ্বাস নিয়ে কারো কারো মনে প্রশ্ন আছে।

প্রতি মাসে দৌলত মিয়া বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে বিভিন্ন মাজার, দরবার ও দানবাক্সে ছুটে যান। সিলেটের হযরত শাহজালালা (রহ:) এর মাজারে প্রতি ওরসে তিনি ৫টি করে গরু পাঠান। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদেও তিনি নিয়মিত দান করেন অঢেল টাকা। এ মসজিদে গিয়ে নাকি দান করলে তার মনের বাসনা পূরণ হয়। সেখানে গিয়ে চোখ বন্ধ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর কাঁপা কণ্ঠে মনে মনে বলেন,

— “হুজুর, আমার ব্যবসায় বরকত দিন। আমার ছেলের চাকরি হোক। আমার অসুখ দূর হয়ে যাক। আমার সব বিপদ কেটে যাক।”

এরপর তিনি টাকা, কাপড়, মিষ্টি ও নানা সামগ্রী রেখে আসেন।

গ্রামের মানুষ তাঁকে দেখে বলে,

— “দৌলত মিয়া বড় দানশীল মানুষ।”

কিন্তু গ্রামের পাশের বাড়ির বৃদ্ধা আমেনা বেগমের ঘরে তখন কয়েক দিন ধরে চুলায় আগুন জ্বলছে না। এতিম শিশু রাকিবের স্কুলের বেতন বাকি পড়ে আছে। অসুস্থ কৃষক জলিল চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে পারছেন না।

দৌলত মিয়া এসব জানেন। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, আগে দরবারে দান করলে তাঁর সব সমস্যা দূর হবে।

এক শুক্রবার জুমার নামাজে গ্রামের মসজিদে খুতবা দিচ্ছেন মাওলানা ইকবাল লতিফ লতিপুরি।

তিনি বলছেন,

“ভাইয়েরা, ইসলাম দানের শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু দানের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানুষের উপকার। দান কোনো লেনদেন নয় যে, আমি কিছু দিলাম আর বিনিময়ে দুনিয়ার কোনো সুবিধা নিশ্চিতভাবে পেয়ে গেলাম।”

এরপর মাওলানা সাহেব কোরআনের সূরা আন-নিসা থেকে ৪:৩৬ আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন—

“তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।” 

তিনি আবার বলেন,

“লক্ষ করুন, আল্লাহ কোথায় দানের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন এতিমের কথা, মিসকিনের কথা, প্রতিবেশীর কথা। কারণ ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষা একটি বড় দায়িত্ব।”

এরপর তিনি সূরা আল-ইনসান  এর ৭৬:৮ আরেকটি আয়াত পড়েন—

“তারা আল্লাহর ভালোবাসায় খাদ্য দান করে মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে।”

মাওলানা সাহেব বলেন,

“প্রকৃত দান হলো যেখানে মানুষের প্রয়োজন আছে, সেখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া।”

দৌলত মিয়া নীরবে বসে আছেন। তাঁর মনে কথাগুলো ধাক্কা দিচ্ছে।

মাওলানা ইকবাল লতিফ লতিপুরি পরের সপ্তাহে জুম্মাবারে খুতবার এক পর্যায়ে আরও বললেন,

“আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের বুঝতে হবে। পীর-দরবেশ, আল্লাহর নেক বান্দারা মানুষ ছিলেন। তাঁরা সম্মানিত হতে পারেন, কিন্তু তাঁরা আল্লাহ নন। জীবিত থাকলেও তাঁরা কারও ভাগ্য পরিবর্তনের মালিক নন, আর মৃত্যুর পর তো তাঁদের কাছে জাগতিক কোনো খাবার, টাকা-পয়সা বা সম্পদের প্রয়োজন হয় না।”

মসজিদে সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

তিনি বলেন,

“অনেক মানুষ মৃত পীর বা দরবেশের কবরের কাছে গিয়ে মানত করে, সাহায্য চায়। কিন্তু একজন মুসলমানের বিশ্বাস হওয়া উচিত—চাওয়া-পাওয়া, বিপদ দূর করা, উপকার করা—সব ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ।”

এরপর তিনি কোরআনের সূরা আল-জিন এর ৭২:২০ আয়াত পড়েন—

“বলুন, আমি তো আমার রবকেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করি না।”

তিনি সূরা ইউনুস এর ১০:১০৬ আয়াত পাঠ করে  আরও বলেন,

‘আর আল্লাহ ছাড়া এমন কাউকে ডেকো না, যে তোমার কোনো উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না।’

তাই কোনো মৃত মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের আশা করা ইসলামের তাওহিদের শিক্ষার সঙ্গে যায় না। মানত, ইবাদত ও সাহায্যের আবেদন একমাত্র আল্লাহর জন্য হতে হবে। তা নইলে এটা তো শিরক হয়ে যায়”।

সেদিন জুমার নামাজ শেষে দৌলত মিয়া অনেকক্ষণ মসজিদের বারান্দায় বসে থাকেন।

মাওলানা সাহেবের কথাগুলো তাঁর মনে ঘুরতে থাকে।

দৌলত মিয়া মনে মনে ভাবেন,

“আমি এত টাকা দিচ্ছি, কিন্তু আমার আশপাশের মানুষের কষ্ট দেখেও না দেখার ভান করছি। তাহলে আমার দানের উদ্দেশ্য কি সত্যিই আল্লাহর সন্তুষ্টি? তাহলে এতদিন টাকা দিয়ে কি আমি শিরক করলাম?”

কয়েক দিন পর গ্রামের মানুষ নতুন এক দৌলত মিয়াকে দেখতে পায়।

তিনি প্রথমে হত দরিদ্র আমেনা বেগমের ঘরে খাবার পৌঁছে দেন। এরপর এতিম রাকিবের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। অসুস্থ কৃষক জলিলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

একদিন পথের মধ্যে মাওলানা সাহেবের সাথে দেখা। তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন,

— “দৌলত মিয়া সাহেব , আপনি এখন আর আগের মতো মাজারে মাজারে যান না?”

দৌলত মিয়া আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন,

“হুজুর, আমি বুঝেছি, আল্লাহকে খুশি করার পথ মানুষের কষ্ট দূর করার মধ্যেও আছে। দান যদি মানুষের কাজে না আসে, শুধু নিজের আশা পূরণের জন্য করা হয়, তাহলে সেই দানের অর্থ কোথায়? আর খাদেমদের পেট মোটা করে আমার লাভ কি? এরা নাকি ঐ দানের টাকা দিয়ে কেউ কেউ নিজের ছেলেমেয়েদের লন্ডন, আমেরিকায় পড়াশোনা করায়! আর আমরা বোকারা ওদের টাকা দিই। আফসোস!

‘হুজুর, পর পর কয়েক জুম্মায় আপনার খুতবা শুনে শুনে এখন আমার চোখ খুলে গেছে। আমি তওবা করেছি আর এভাবে কোন মাজারে গিয়ে টাকা পয়সা দান করবো না, কিছু চাইবো না, চাইবো শুধু সরাসরি আল্লাহর কাছে।’’

মাওলানা ইকবাল লতিফ লতিপুরি দৌলত মিয়া এই পরিবর্তনে খুব খুশি হলেন। তিনি বললেন, বাহ! আপনার মতো বিজ্ঞ আর ধনী মানুষও যে আমার খুতবা শুনে সঠিক পথে এসেছেন এর জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। এরপর গ্রামের মানুষকে বলেন,

“দান ছোট-বড় দিয়ে বিচার হয় না। নিয়ত দিয়ে বিচার হয়। যে দান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং মানুষের কল্যাণে করা হয়, সেটিই প্রকৃত দান।”

সেদিন থেকে গ্রামের মানুষ দৌলত মিয়ার দানখয়রাতকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করে।

কারণ তিনি শুধু টাকা দেওয়া মানুষ ছিলেন না, তিনি শিখে নিয়েছেন—সত্যিকারের দান হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর সৃষ্টির পাশে দাঁড়ানো।

লন্ডন, ২৩ জুলাই ২০২৬