বাংলাদেশের বিনোদন জগতে চলছে তীব্র ক্রান্তিকাল

বাংলাদেশের বিনোদন জগতে চলছে তীব্র ক্রান্তিকাল

বিনোদন ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল, ২৪ জুলাই:

একসময় ঈদ মানেই ছিল নতুন সিনেমার উৎসব, ইউটিউবে নাটকের প্রতিযোগিতা, আর নতুন গানের ঝড়। সিনেমা হলের সামনে দীর্ঘ সারি, নাটকের কোটি কোটি ভিউ, কনসার্টে উপচে পড়া ভিড়—এসবই ছিল বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পের পরিচিত চিত্র। অথচ এখন সেই শিল্পের বড় একটি অংশ যেন অদৃশ্য এক সংকটের মধ্যে আটকে আছে। চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীত—তিনটি প্রধান মাধ্যমই বিনিয়োগ সংকট, দর্শকের বদলে যাওয়া অভ্যাস এবং বাজারের অনিশ্চয়তায় কঠিন সময় পার করছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে এগোবে দেশের শোবিজ। নীতিগত সংস্কার, নতুন বিনিয়োগ এবং সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, প্রত্যাশা আর বাস্তবের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

চলচ্চিত্র শিল্পের চিত্র সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। বড় বাজেটের সিনেমাগুলো এখনও মূলত দুই ঈদকে ঘিরেই মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত অধিকাংশ সিনেমা প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারেনি। ফলে প্রযোজকদের মধ্যে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সাহস কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাজার বহু বছর ধরেই মূলত কয়েকজন তারকানির্ভর। বিশেষ করে শাকিব খানকে কেন্দ্র করেই বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কয়েকটি আলোচিত ছবিও প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি বলে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্যদিকে আরেফিন শুভ, সিয়াম আহমেদ, আফরান নিশো কিংবা নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা তৈরি হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ পুরোপুরি ফেরত আসছে না। এতে প্রযোজকেরা ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।

শুধু সিনেমাই নয়, নাটক শিল্পেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ঈদ কিংবা বিশেষ উৎসবকে ঘিরে নির্মিত নাটকের বাজেট আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। উন্নত ক্যামেরা, বিদেশে শুটিং, জনপ্রিয় শিল্পীদের পারিশ্রমিক—সব মিলিয়ে ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে আয় বাড়ছে না। ইউটিউবের বিজ্ঞাপন আয়ের পরিবর্তিত কাঠামো, দর্শকের বিচ্ছিন্ন মনোযোগ এবং অতিরিক্ত কনটেন্টের ভিড়ে অনেক নাটক প্রত্যাশিত দর্শক পাচ্ছে না।

ফলে বড় আয়োজনের নাটক কমে যাচ্ছে। কোরবানির ঈদের পর থেকে নাটক নির্মাণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক অভিনয়শিল্পী নিয়মিত কাজ না পেয়ে বিদেশ ভ্রমণ, ব্যবসা কিংবা বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকছেন। নতুন অভিনয়শিল্পীদের জন্যও সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে কঠিন সময় সম্ভবত পার করছে সংগীতাঙ্গন। একসময় শিল্পীদের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল স্টেজ শো, করপোরেট অনুষ্ঠান এবং কনসার্ট। কিন্তু বর্তমানে অনুষ্ঠান কমে যাওয়ায় সেই আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোটি ভিউ না হলে সংগীত প্রযোজকদের পক্ষে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফলে নতুন গান তৈরির সংখ্যাও কমছে। অনেক গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক দীর্ঘ সময় ধরে বড় কোনো প্রকল্প পাচ্ছেন না। সংগীত প্রযোজকেরা বলছেন, উৎসব ছাড়া নতুন গান প্রকাশ করলে আর্থিকভাবে লাভের সম্ভাবনা খুবই কম। এমনকি ঈদকেন্দ্রিক অনেক গান থেকেও বিনিয়োগ উঠে আসছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের পেছনে শুধু একটি কারণ কাজ করছে না। দর্শকের বড় অংশ এখন আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, শর্ট ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিনোদনের দিকে ঝুঁকেছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওর যুগে দুই ঘণ্টার সিনেমা কিংবা দীর্ঘ নাটকের জন্য দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের সিনেমা হলের সংখ্যাও গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়লেও সেগুলো এখনও দেশের সামগ্রিক বাজারের তুলনায় খুবই সীমিত। ফলে ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয় না।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু তারকানির্ভরতা দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী চিত্রনাট্য, নতুন নির্মাতা, আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা, আধুনিক বিপণন কৌশল এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা। একই সঙ্গে পাইরেসি নিয়ন্ত্রণ, কপিরাইট সুরক্ষা এবং সরকারি নীতিগত সহায়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সংকটের মাঝেও সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতারা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা পাচ্ছেন, কয়েকটি ওয়েব সিরিজ বৈশ্বিক দর্শকের নজর কাড়ছে এবং স্বাধীন সংগীতশিল্পীরাও ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন শ্রোতা তৈরি করছেন। অর্থাৎ প্রতিভার অভাব নেই; অভাব রয়েছে টেকসই বাজার, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।

বাংলাদেশের বিনোদন শিল্প আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখনই যদি শিল্পী, প্রযোজক, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকেরা সমন্বিত উদ্যোগ না নেন, তাহলে এই সাময়িক মন্দা দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হতে পারে। আর যদি সময়োপযোগী সংস্কার ও সৃজনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তবে এই ক্রান্তিকালই হয়তো আগামী দিনের নতুন জাগরণের সূচনা হয়ে উঠবে।