বাংলাদেশ সংবাদ

সিসিটিভিতে খুনি, অধরা নেপথ্যের হোতা: সাত মাসে হত্যা ২,০৭৩

সিসিটিভিতে খুনি, অধরা নেপথ্যের হোতা: সাত মাসে হত্যা ২,০৭৩

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৪ আগস্ট:

রাজধানী থেকে জেলা—প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা, অপহরণের পর লাশ উদ্ধার, মাদককেন্দ্রিক পারিবারিক হত্যাকাণ্ড এবং চাঁদাবাজির জেরে হামলা। অপরাধের ধরন ভিন্ন হলেও একটি বিষয় ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে—হামলাকারী অনেক সময় ধরা পড়লেও নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে ২ হাজার ৭৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ২৯৬টি, আর দিনে প্রায় ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জুলাই মাসে একাই হত্যা মামলা হয়েছে ২৯৮টি

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ২৯৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৩ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি হত্যা মামলা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে; দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ।

সাম্প্রতিক অপরাধের চিত্র বলছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধই একমাত্র কারণ নয়। মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, আর্থিক স্বার্থ, পুরোনো শত্রুতা ও সংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

তিন মাসে গড়ে ৩১১ হত্যা

গত মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে গড়ে প্রতি মাসে ৩১১টি করে হত্যা মামলা হয়েছে। একই সময়ে অপরাধের অন্যান্য ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

শুধু জুলাই মাসেই সারা দেশে—

  • ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১৩টি
  • অপহরণের ঘটনায় ৭২টি
  • নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২ হাজার ৩৩৬টি
  • চুরির ঘটনায় ২৮৭টি

পুলিশের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম চার মাসেই হত্যা, অপহরণ, নারী-শিশু নির্যাতন, ডাকাতি-দস্যুতা এবং চুরি-ছিনতাই—এই পাঁচ ধরনের অপরাধে মোট ১৩ হাজার ২২১টি মামলা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১০টি মামলা

মাদক: অপরাধের নতুন কেন্দ্রবিন্দু?

সাম্প্রতিক কয়েকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তে মাদক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবহার করে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ব্যবহারকারীদের বড় অংশই তরুণ।

জুলাই মাসে মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে আরও পাঁচজনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবা-মা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একাধিক।

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ ওঠে, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

ফরিদপুরে মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে হত্যার অভিযোগে এক তরুণ গ্রেপ্তার হয়। সাভার, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতেও মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে পরিবারের সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।

মাদক শুধু পারিবারিক সহিংসতাই বাড়াচ্ছে না; নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য তরুণদের একটি অংশ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, অপহরণ এবং হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি

গত সাত মাসে সারা দেশে অন্তত ১১০টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীতে ১৩টি গুলির ঘটনায় ছয়জন নিহত এবং নয়জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ৩৭টি গুলির ঘটনা ঘটেছে খুলনায়

চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, খুলনায় রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যা এবং রাজধানীতে বিভিন্ন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা দেখিয়েছে—অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো অপরাধী নেটওয়ার্কের একটি বড় শক্তি।

সাম্প্রতিক টার্গেট কিলিংয়ের তদন্তে আরও একটি বিষয় সামনে আসছে—হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য পেশাদার শুটার ভাড়া করা হচ্ছে। মিরপুরে যুবদলকর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশ এমন একটি চক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য লক্ষ্য ব্যক্তিকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তির কথাও তদন্তে এসেছে।

সিসিটিভিতে শুটার, কিন্তু কোথায় মাস্টারমাইন্ড?

সাম্প্রতিক বহু হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। হামলাকারীদের অস্ত্র, মোটরসাইকেল, পোশাক, গতিবিধি এবং পালানোর পথও অনেক ক্ষেত্রে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে—শুটারের পেছনের নেটওয়ার্কে পৌঁছানো

তদন্তকারীদের ধারণা, অনেক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে একাধিক স্তর কাজ করে। একজন নির্দেশদাতা, একজন বা একাধিক মধ্যস্থতাকারী, অর্থের জোগানদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, লক্ষ্য ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী, শুটার এবং পালানোর ব্যবস্থাকারী—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অপরাধের একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক।

এই কাঠামোয় শেষ মুহূর্তে ট্রিগার টানা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা গেলেও নির্দেশদাতাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

কিছু মামলার তদন্তে বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নামও এসেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নির্দেশদাতাকে এখন আর ঘটনাস্থলে থাকতে হচ্ছে না। বিদেশ বা আত্মগোপন থেকে স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে অপরাধ সংগঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একদিনেই তিন জেলায় কুপিয়ে হত্যা

সাম্প্রতিক ঘটনার ধারাবাহিকতায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ২৪ আগস্ট রাত থেকে ২৫ আগস্টের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা আল-আমিন সৈকতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। একই রাতে বগুড়ায় সাবেক ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

সিলেট নগরেও নিজ বাসার সামনে ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইয়ের অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে ড্রেন থেকে অপহৃত এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় আরও একাধিক লাশ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

এসব ঘটনার কারণ এক নয়। কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ, কোথাও অপরাধী চক্র, কোথাও মাদক, আবার কোথাও অপরাধের কারণ এখনো অজানা। কিন্তু সামগ্রিক চিত্রটি একই—জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব হামলাও উদ্বেগে

মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসএফের সাত মাসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৬২ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জন আহত হয়েছেন।

একই প্রতিবেদনে মব সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত ও ২৫৬ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ছয়জন নিহত ও ১৬৪ জন আহত হন। একই মাসে মব সহিংসতায় ১৭ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং, মাদককেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার যোগ করলে দেশের সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতির একটি বহুমাত্রিক সংকটের চিত্র ফুটে ওঠে।

এখন প্রয়োজন অপরাধের ‘ম্যাপিং’

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করলেই যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন অপরাধী নেটওয়ার্কের ডেটাভিত্তিক ম্যাপিং

কোন এলাকায় কারা সক্রিয়, কারা অবৈধ অস্ত্র সরবরাহ করছে, কোন চক্র মাদক ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, কারা পেশাদার হামলাকারী নিয়োগ করছে এবং অপরাধের অর্থ কোথা থেকে আসছে—এসব প্রশ্নের সমন্বিত উত্তর খুঁজতে হবে।

পুলিশের পেশাদারিত্ব ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। কারণ অপরাধী যদি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব বা ক্ষমতার আশ্রয়ে সুরক্ষা পায়, তাহলে শুটার ধরা পড়লেও অপরাধের মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থেকে যেতে পারে।

সাত মাসে ২ হাজার ৭৩টি হত্যা মামলার পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা নিয়ে একটি কঠিন সতর্কবার্তা। সিসিটিভি ক্যামেরায় হামলাকারীর মুখ দেখা গেলেও এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—তার পেছনে কারা, কার অর্থে এবং কার নির্দেশে অপরাধের এই চক্র চলছে?

শুটার গ্রেপ্তারের সাফল্যের পাশাপাশি মাস্টারমাইন্ড ও পুরো অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে টার্গেট কিলিং, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকঘিরে সহিংসতার এই চক্র থামানো কঠিন হবে।