ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৭ ।। বাংলাদেশে হরদম চলছে অনলাইন জুয়া : ফলে মূল্যবোধ যাচ্ছে খোয়া
উৎসর্গ
যারা এখনো সময় থাকতে জুয়ার মতো ভয়াবহ অনলাইন গেম থেকে ফিরে আসতে চায়, তাদের প্রতি
আজকাল বিদেশে বসে পত্র-পত্রিকা আর টিভি বা সমাজ মাধ্যমে যা দেখছি তাতে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তিত না হয়ে পারা যায় না। দেশ ছেড়ে চলে এলেও দেশ কিন্তু আমাকে ছাড়েনি। তাই প্রতিদিন বিবেক বাধ্য করে বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বলতে। দেশে বা বিদেশের কোন লেখক ‘প্রতিদিন’ কলাম লিখে-এটা বোধহয় বিরল। কিন্তু আমি লিখে যেতে চাই অবিরল। বাড়াতে চাই পাঠকের মনোবল। ইচ্ছে করলে ব্রিটেন বা বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, জীবন ইত্যাদি নিয়ে লিখতে পারি। লিখেও থাকি। কিন্তু যখন ‘কলিকালের কলধ্বনি’ ফাইনালি প্রকাশ করতে বসি, তখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গই টানে বেশি। কারণ ভিতরে ভিতরে এখনও যে নিজেকে ভাবি ‘দেশি’। তাই ‘দেশ নিয়েই’ কলম থেকে লেখা বের হয় বেশি বেশি। আজকে টা্ইপ করতে গিয়ে ব্যথা করছে ডান হাতের পেশী। একটু আগে ‘সেন্ট থমাস হসপিটাল‘ এর ইমারজেন্সি থেকে ডাক্তার দেখিয়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে এলাম। এক সপ্তাহ ‘ডানহাতের কাজ’ বন্ধ রাখতে বলেছে ডাক্তার। কে শুনে কথা তার? তারপরও চলছে লেখার কাজ। যাই হোক, আজকের কলাম প্রসঙ্গে আসা যাক। হাত তার জায়গায় থাক!
একসময় জুয়া মানে ছিল গ্রামের হাটের গোপন তাসের আসর, অথবা শহরের কোনো অন্ধকার কোণের লুকানো আড্ডা। সমাজ তখনও জুয়াকে খারাপ বলেই জানত। প্রবাদ ছিল তখর, ‘জুয়ায় পুয়া হারায়’। পরিবারে কেউ জুয়াড়ি হলে তাকে লজ্জার চোখে দেখা হতো। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন জুয়া আর গোপন ঘরে বসে হয় না—এখন তা মানুষের পকেটের ভেতর ঢুকে গেছে। একটি স্মার্টফোন, সামান্য ইন্টারনেট আর কিছু প্রলোভনসঙ্কুল বিজ্ঞাপন—এই তিন জিনিসই আজ হাজারো পরিবার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই ধ্বংসযজ্ঞকে অনেকেই এখনও “খেলা” বলে মনে করেন। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, এটি কোনো খেলা নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক মহামারি। যে মহামারি নীরবে মানুষের অর্থ, সম্পর্ক, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎকে গ্রাস করছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই আসক্তি শুধু অর্থ কেড়ে নিচ্ছে না—কেড়ে নিচ্ছে মানুষের নৈতিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক মূল্যবোধও।

পবিত্র কুরআনেও জুয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারণকারী শরসমূহ অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।”
— সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৯০
পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন:
“শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে।”
— সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ৯১
এই আয়াতগুলোর গভীর তাৎপর্য আজকের সমাজে ভয়াবহভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। অনলাইন জুয়া মানুষকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব করছে না, বরং পরিবারে অশান্তি, সমাজে বিদ্বেষ, অপরাধ এবং মানসিক বিপর্যয়ও বাড়িয়ে তুলছে। যে যুবক একসময় স্বপ্ন দেখত নিজের পরিবারকে সুখী করার, সে আজ রাতভর মোবাইল স্ক্রিনে ভাগ্যের পেছনে ছুটছে। যে শিক্ষার্থী বই হাতে ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ছিল, সে এখন বেটিং অ্যাপের হিসাব কষছে।
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন উদ্বেগজনক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে, বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বেকার যুবক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমনকি নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষও এর শিকার হচ্ছেন। শুরুটা হয় খুব ছোট অঙ্ক দিয়ে। প্রথমে কিছু টাকা জেতানো হয়, যাতে মানুষ লোভে পড়ে। এরপর শুরু হয় আসল ফাঁদ। মানুষ ধার নেয়, সঞ্চয় ভাঙে, গয়না বিক্রি করে, জমি বন্ধক রাখে—শুধু হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায়। কিন্তু জুয়ার নিয়ম একটাই: শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়ই হারবে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংস্থাগুলোর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুয়ায় আসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৩০ শতাংশ তীব্র মানসিক অবসাদ ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন। অনেকে হতাশা, অনিদ্রা, উদ্বেগ ও আত্মঘাতী প্রবণতার শিকার হচ্ছেন। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে আইন ও পুলিশের ভূমিকা এখনও অপ্রতুল। এ পর্যন্ত ২ হাজার ৬০০-এর বেশি জুয়ার সাইট এবং অসংখ্য মোবাইল অ্যাপ ব্লক করা হলেও বাস্তবে কার্যকর ফল খুব কমই দেখা গেছে। কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নতুন নতুন অ্যাপ ও সাইট প্রতিনিয়ত ফিরে আসছে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই আসক্তি এখন পরিবার ধ্বংস করছে। একজন তরুণ যখন রাতভর ফোনে বেটিং করে, তখন শুধু সে একাই নষ্ট হয় না—তার মা-বাবার স্বপ্নও ধ্বংস হয়। একজন স্বামী যখন সংসারের টাকা জুয়ায় হারায়, তখন তার সন্তানের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষার্থী যখন পড়াশোনার বদলে অনলাইন বেটিংয়ে ডুবে যায়, তখন একটি জাতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজ সমাজে আত্মহত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, চুরি, ছিনতাই ও অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে অনলাইন জুয়ার ভূমিকা ভয়াবহভাবে সামনে আসছে। অনেকে ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। কেউ বন্ধুর টাকা হারিয়ে প্রাণ দিচ্ছেন, কেউ আবার পরিবারের কাছে মুখ দেখাতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। একটি মোবাইল অ্যাপ কীভাবে একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ধ্বংস করতে পারে, সেটি আমরা এখন বাস্তবে দেখছি।
আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—এই ব্যবসা এখন সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, সহজ মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন—সব মিলিয়ে এটি একটি বিশাল প্রতারণার জাল। মানুষ বুঝে ওঠার আগেই সেই জালে আটকে যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চক্র শুধু মানুষের টাকা লুট করছে না; দেশের বিপুল অর্থও বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
অনলাইন জুয়ার আরও একটি ভয়াবহ দিক হচ্ছে—এটি মানুষের বিবেককে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। প্রথমে মানুষ ভাবে “একবার চেষ্টা করি”, তারপর “হারানো টাকা ফেরত আনব”, এরপর শুরু হয় মিথ্যা বলা, পরিবারের কাছ থেকে টাকা লুকানো, বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেওয়া, এমনকি চুরি বা অপরাধের পথেও পা বাড়ানো। অর্থাৎ জুয়া শুধু পকেট খালি করে না, মানুষের চরিত্রকেও ধ্বংস করে দেয়।
কিন্তু আরও গভীর যে ক্ষত তৈরি হচ্ছে, সেটি হলো মূল্যবোধের অবক্ষয়। আজ অনেক তরুণ পরিশ্রম ছাড়া রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সততা, অধ্যবসায়, ধৈর্য—এসব গুণ যেন ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে। “কম সময়ে বেশি টাকা”—এই বিপজ্জনক মানসিকতা সমাজকে এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যখন একটি প্রজন্ম শ্রমের বদলে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে শেখে, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হচ্ছে—সমাধান কোথায়?
শুধু আইন দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কারণ প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাচ্ছে, অপরাধের কৌশলও তত দ্রুত পাল্টাচ্ছে। তাই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে পরিবার থেকেই। বাবা-মাকে সন্তানের আচরণ বুঝতে হবে। রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার, হঠাৎ অর্থের চাহিদা বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক রাগ বা হতাশা—এসব লক্ষণকে অবহেলা করা যাবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের স্কুল-কলেজে প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া হয়, কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা খুব কম। তরুণদের বোঝাতে হবে—অনলাইন জুয়া কখনো আয় বা বিনোদনের পথ নয়; এটি ধ্বংসের রাস্তা।
মসজিদের খতিব, সমাজের সচেতন মানুষ, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং অভিভাবকদেরও একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি জাতীয় সংকটের রূপ নিচ্ছে। যেভাবে মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরি করা হয়, ঠিক সেভাবেই অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
একইসঙ্গে সামাজিকভাবেও এই বিষয়ে নীরবতা ভাঙতে হবে। অনেক পরিবার লজ্জার ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। অথচ গোপন রাখলেই সমস্যা আরও ভয়ংকর হয়। মাদকাসক্তির মতো জুয়া আসক্তিকেও এখন একটি সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রকেও আরও কঠোর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু কিছু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই হবে না। মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন নজরদারি, এজেন্ট চক্র শনাক্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়ার বিজ্ঞাপন বন্ধ এবং সাইবার ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। পাশাপাশি, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও সুস্থ বিনোদনের পরিবেশ তৈরি না হলে এই আসক্তি থামানো কঠিন হবে।
মনে রাখতে হবে, একটি জাতি শুধু যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষে ধ্বংস হয় না। কখনও কখনও একটি জাতি ধ্বংস হয় নীরব আসক্তিতে, যা ধীরে ধীরে মানুষের বিবেক, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে। অনলাইন জুয়া এখন সেই নীরব আগুনে পরিণত হয়েছে।
আজ যদি আমরা সতর্ক না হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো স্মার্টফোন হাতে নিয়ে শুধু প্রযুক্তির সুবিধাই পাবে না—পাবে ধ্বংসের সবচেয়ে সহজ দরজাটিও।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৬ মে ২০২৬