ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১২৬ ।। বাংলাদেশের বর্তমান চলমান সংকট থেকে জাতিকে বাঁচাতে আগে দরকার পুরো জাতির মানসিক চিকিৎসা
উৎসর্গ
“একটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া সমাজকে সচেতন করার প্রয়াসে”

বাংলাদেশে আজ যে সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আর শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ, দুর্ঘটনা বা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কথায় কথায় একে অন্যকে হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা, নিজের বাবা-মা বা সন্তানকে হত্যা, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন, শিশু হত্যা, ঘুষ-দুর্নীতি, মিথ্যাচার, চাঁদাবাজি, দেশাত্ববোধের প্রতি মমত্ব না থাকা, একে অপরের প্রতি হিংসা, অপরের ভাল দেখে সহ্য না করার প্রবণতা, শুধু নিজের পরিবার নিয়েই সুখি হবার আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, মাদকে আসক্তি, আইন না মানার প্রবণতা—সব মিলিয়ে সমাজের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই অস্থিরতাকে শুধু নৈতিক অবক্ষয় বা আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা বলে ব্যাখ্যা করলেই পুরো চিত্র বোঝা যায় না। এর ভেতরে আরও গভীরভাবে কাজ করছে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট। আসলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুরো জাতির মধ্যে কমবেশি প্রায় সবারই মানসিক সংকট বা সমস্যা বিরাজমান। কিন্তু বাংলাদেশে এই মানসিক রোগকে সবাই লুকিয়ে রাখে। মানসিক রোগীর বিষয় আসলেই সবাই মনে করে ‘পাগল’। আসলে এই ধারণা সঠিক নয়।
২০১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৮.৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও এই হার ১৩.৬ শতাংশের মতো। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, আক্রান্তদের ৯০ শতাংশেরও বেশি কোনো ধরনের চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যান। WHO ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের যৌথ এই জরিপ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে একটি নীরব কিন্তু বিস্তৃত সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।
এই সংখ্যাগুলো কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি একটি সামাজিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। কারণ মানসিক রোগ মানুষের চিন্তা, আচরণ, সম্পর্ক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, উদ্বেগ, হতাশা বা ট্রমা অনেক সময় মানুষের ভেতরে রাগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, সহনশীলতা দুর্বল করে এবং হঠাৎ আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে এই বাস্তবতার ছায়া স্পষ্ট হয়। পারিবারিক বিরোধ থেকে খুন, তুচ্ছ ঘটনায় সহিংসতা, মা হয়ে নিজের সন্তানকে হত্যা, ছেলে হয়ে মা-বাবাকে হত্যা, সম্পর্কজনিত ব্যর্থতায় আত্মহত্যা, কিংবা হঠাৎ ক্ষোভে চরম অপরাধ—এসব ঘটনার পেছনে অনেক সময় দীর্ঘ মানসিক চাপের ইতিহাস কাজ করে, যা চিকিৎসার বাইরে থেকে যায় বা কখনো শনাক্তই হয় না।
এই বাস্তবতার সঙ্গে আরও একটি কঠিন সামাজিক সত্য যুক্ত রয়েছে। সমাজে নীতিহীনতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকা এবং সার্বিকভাবে আইনের শাসন কার্যকরের অভাবও অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার অপরাধের সঙ্গে দরিদ্রতারও সম্পর্ক রয়েছে। কেউ কেউ অর্থের জন্য বাধ্য হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে এখানে একটি বহুমাত্রিক চাপ একসঙ্গে কাজ করছে—মানসিক অস্থিরতা, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা।
সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাঁরা দায়িত্বে থাকেন, তাঁদের কার্যকর ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে। পুলিশের কঠোর নজরদারি, মাঠে সতর্ক উপস্থিতি এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ কমাতে সহায়তা করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কেবল দমননীতি যথেষ্ট নয়, কারণ সমস্যার শিকড় আরও গভীরে।
এই জায়গায় পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবারই প্রথম জায়গা যেখানে একজন মানুষের মানসিক গঠন তৈরি হয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা পারবে অপরাধের লাগাম টেনে ধরতে। পরিবার ও সমাজের উদ্যোগ পারিবারিক সংকট ও টানাপোড়েন কমাতে সহায়তা করতে পারে। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ—সুধীসমাজ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—সবাই মিলে একটি সহনশীল সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে এই চাপ আরও বাড়তে থাকবে।
নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার একটি বড় অংশ পারিবারিক সহিংসতা থেকে জন্ম নিচ্ছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র অমিল ও মনোমালিন্য, সন্তানকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, আর্থিক টানাপোড়েন—এসব কারণে অনেক পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি তৈরি হচ্ছে। এই অশান্তি যখন মানসিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়ন্ত্রণহীন আচরণে রূপ নেয়। রাগ দমনের পর অনুশোচনা এলেও যে ক্ষতি একবার ঘটে যায়, তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
মাদকাসক্তিও এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী দেশে প্রায় ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। এর বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মাদকাসক্তি নিজেই একটি মানসিক রোগ, যা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে সহিংসতা, অপরাধ এবং আত্মধ্বংসী আচরণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে যে চিত্রটি দাঁড়ায়, তা হলো—বাংলাদেশে অপরাধ, সহিংসতা, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যা এবং সামাজিক অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলোর ভেতরে একটি অভিন্ন সূত্র কাজ করছে, আর তা হলো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি।
আজকের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ লন্ডনে আমাদের আশপাশেই বসবাস করেছেন। আশা করি, আজকের এই কলামের বিষয়বস্তু তিনি আন্তরিকভাবে অনুধাবন করবেন এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবেন। একই সঙ্গে প্রত্যাশা থাকে, এসব বিষয় আমলে নিয়ে তিনি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
অন্যথায়, কেবল কোনো একক পক্ষের মাধ্যমে এ দেশের জনগণের যথাযথ দেখভাল বা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাই প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন জাতির মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও পুনর্গঠন।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, এবং তাদের অধিকাংশই চিকিৎসার বাইরে। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল আইনশৃঙ্খলা দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ আইন অপরাধকে দমন করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের ভাঙনকে সারাতে পারে না।
তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের নয়। প্রশ্নটা হলো—একটি পুরো জাতি মানসিকভাবে কতটা সুস্থ অবস্থায় আছে?
এই প্রেক্ষাপটে একটি সত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমান চলমান সংকট থেকে জাতিকে বাঁচাতে আগে দরকার পুরো জাতির মানসিক চিকিৎসা। কারণ যে সমাজ তার মানুষের ভেতরের কষ্ট, চাপ ও মানসিক ভাঙনকে উপেক্ষা করে, সেই সমাজ একসময় সেই ভাঙনের প্রতিফলনই দেখে সহিংসতা, অপরাধ এবং সামাজিক অস্থিরতার মাধ্যমে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৪ মে ২০২৬