সিলেটের অপরাধ জোন দক্ষিণ সুরমাকে ঘিরে বাড়ছে অপরাধ

সিলেটের অপরাধ জোন দক্ষিণ সুরমাকে ঘিরে বাড়ছে অপরাধ

সিলেট প্রতিনিধি, ২৬ মে:

সিলেট নগরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যের প্রতীক ক্বিন ব্রিজ। এক পাশে আলী আমজাদের ঘড়ি, অন্য পাশে সারদা হল—দৃশ্যত এটি পর্যটন ও ভিআইপি জোন। কিন্তু এই একই এলাকাই এখন বারবার উঠে আসছে নগরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নে—নিরাপত্তা কোথায়?

র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে সিলেটের অপরাধ মানচিত্র। ব্যস্ততম এই ক্বিন ব্রিজ এলাকা এবং এর আশপাশে এমন ভয়াবহ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টনক নড়েছে। র‌্যাব ও পুলিশের নজর এখন নগরের চিহ্নিত অপরাধ আস্তানাগুলোর দিকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্বিন ব্রিজের নিচের অংশ—বিশেষ করে সারদা হল ও আলী আমজাদের ঘড়ির আশপাশ, চাঁদনিঘাট, বাস স্ট্রেশন, রেলস্টেশন, কদমতলি পয়েন্ট, নতুন পুল, ইন্ড্রাসট্রি ইত্যাদি এলাকা—আশি-নব্বই দশক থেকেই মাদকসেবী, ছিনতাইকারী ও অসামাজিক চক্রের দখলে। সন্ধ্যা নামলেই এই এলাকা যেন ভিন্ন এক জগতে পরিণত হয়। দক্ষিণ সুরমা এলাকা থেকে এসে অনেকেই উত্তর সুরমার এসব এলঅকায় অপকর্ম করে কেটে পড়ে নিজ এলাকায়। উত্তর সুরমার ক্বিন ব্রিজ হচ্ছে কোতোয়ালি থানার প্রবেশমুখ এবং নগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। তাই ছিনতাই ও হেনস্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ ও আতঙ্ক কাজ করছে।

ক্বিনব্রিজের নিচে (স্থানীয় ভাষায় পুলের তল) অপরাধীদের আনাগোনা নিয়ে নতুন করে কঠোর অবস্থানে গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইমন আচার্য হত্যার ঘটনার পর সেখানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। গত শনিবার ওই ক্যাম্প উদ্বোধন করা হয়। এখন সেখানে নিয়মিত পুলিশ উপস্থিতি এবং টহল কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

কোতয়ালী থানার ওসি জানিয়েছেন, ক্বিন ব্রিজের নিচের ওই অংশকে অপরাধমুক্ত রাখতে অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অন্তত দৃশ্যমান অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। স্থানীয় সূত্র বলছে, শুধু ক্বিন ব্রিজ নয়, পুরো দক্ষিণ সুরমা এলাকাজুড়েই একাধিক অপরাধের হটস্পট গড়ে উঠেছে। মাদক কেনাবেচা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি—সবকিছুরই ছায়া বিস্তৃত এই অঞ্চলে। বিশেষ করে কুমারগাঁও তেমুখী, টিলাগড় ও শাহপরান এলাকায় নিয়মিত অপরাধচক্রের উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে নগরে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে তিন শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত দুই মাসে এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলেও দাবি তাদের। তবে প্রশ্ন উঠছে—এত গ্রেপ্তারের পরও কেন অপরাধ কমছে না?

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা হচ্ছে “সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ”। একাধিক মাদক ও ছিনতাই চক্র নির্দিষ্ট কিছু আস্তানা থেকে পুরো নগর নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশ অভিযান চালালে তারা সাময়িকভাবে গা ঢাকা দেয়, কিন্তু আবার ফিরে আসে পুরনো অবস্থায়।

র‌্যাব সদস্য ইমন আচার্য হত্যাকাণ্ডের পর র‌্যাব-৯ নগরে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। ক্বিন ব্রিজসহ চিহ্নিত অপরাধ জোনগুলোতে ব্লক রেইড চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি আস্তানা থেকে বেশ কিছু সন্দেহভাজনকে আটকও করা হয়েছে।

র‌্যাব-৯ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধু অভিযান নয়—মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হচ্ছে। তাদের মতে, মাদকই অধিকাংশ অপরাধের মূল চালিকাশক্তি, তাই সেটি বন্ধ না হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।

অন্যদিকে ঈদকে সামনে রেখে নগরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে। সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রশাসনের দাবি, পুরো নগরকে একটি নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা হয়েছে।

তবে বাস্তব চিত্র বলছে, দক্ষিণ সুরমা এখন শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়—বরং সিলেট নগরের অপরাধ মানচিত্রে একটি চাপা আতঙ্কের নাম। একদিকে উন্নয়ন, পর্যটন ও ঐতিহ্য, অন্যদিকে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অপরাধচক্র—এই দুই বাস্তবতার টানাপোড়েনেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের সিলেট।