বাংলাদেশ সংবাদ

ওষুধের বাজারে নতুন শঙ্কা, উৎপাদন বন্ধ ৬০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের

ওষুধের বাজারে নতুন শঙ্কা, উৎপাদন বন্ধ ৬০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৬ আগস্ট:

রোগীর জন্য সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তে যে ওষুধটি প্রয়োজন, সেটিই যদি বাজারে না মেলে—তাহলে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে অনিশ্চয়তাও। বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ নিয়ে এখন সেই আশঙ্কাই তৈরি হয়েছে।

দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি)। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে দাম যথাযথভাবে সমন্বয় না হওয়াকে এর প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন শিল্প মালিকরা।

সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাপির কার্যালয়ে ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানানো হয়।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উৎপাদন বন্ধ থাকা ওষুধের জায়গা নিতে বাজারে আসছে তুলনামূলক বেশি দামের বিকল্প ব্র্যান্ড। ফলে কোনো রোগীর নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োজন হলে তাকে অনেক সময় বেশি অর্থ খরচ করে বিকল্প ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এর সরাসরি চাপ পড়ছে রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর।

বাপির নেতারা বলছেন, ওষুধের দাম নির্ধারণে এখনও মূল ভিত্তি ১৯৯৪ সালের মূল্য কাঠামো। গত ৩২ বছরে এ কাঠামোর আওতায় মাত্র দুবার দাম সমন্বয় হয়েছে। অথচ এ সময়ে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার, শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়—সবই বেড়েছে।

শিল্প মালিকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওষুধের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তা না হলে কম দামের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে লোকসান গুনতে হবে কোম্পানিগুলোকে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে বাজারের সরবরাহ ব্যবস্থায়।

শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও ওষুধ উৎপাদনকে কঠিন করে তুলছে। বাপির মহাসচিব মুহাম্মদ হালিমুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কারখানাকে জেনারেটর, বড় ইউপিএস ও বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবও অন্য শিল্পের তুলনায় আলাদা। একটি উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো ব্যাচ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত জ্বালানি ও ব্যাকআপ ব্যবস্থায় অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। গ্যাসের সংকটে জেনারেটর চালাতেও অনেক ক্ষেত্রে ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বাপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন জানান, ১৯৯৪ সালের নীতির আওতায় ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হলেও ১৯টি ওষুধ উৎপাদনের জন্য নিবন্ধিত হয়নি। বাকি ৯৮টির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন খরচ না ওঠায় এসব ওষুধের একটি বড় অংশ উৎপাদন থেকে সরে গেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা অবশ্য অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদের বিরোধিতা করছেন না। বরং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা এবং দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাপির সাবেক মহাসচিব ডা. জাকির হোসেন বলেন, শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ওষুধ শিল্পকে দেখলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রয়োজনীয় ওষুধ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকার চাইলে ভর্তুকি অথবা সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে কম দামে তা সরবরাহ করতে পারে।

তার মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ক্রয়াদেশ ও নিশ্চিত বাজার থাকে, পাশাপাশি বিপণন ব্যয়ের চাপও তুলনামূলক কম।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম কম রাখার সঙ্গে উৎপাদন অব্যাহত রাখার ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে?

কারণ ওষুধ কোনো সাধারণ পণ্য নয়। বাজারে একটি সাবান বা পোশাকের বিকল্প না থাকলে ভোক্তা অন্য পণ্য বেছে নিতে পারেন। কিন্তু নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে সেই বিকল্প সবসময় থাকে না।

ফলে উৎপাদন ব্যয়, ওষুধের মূল্য এবং রোগীর সামর্থ্য—এই তিনটির মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। তা না হলে কাগজে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় থাকা ওষুধ বাস্তবে রোগীর নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।