বাংলাদেশ সংবাদ
মাদক, বেকারত্ব আর বন্ধ কারখানার দেশে এবার যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তুতি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৬ আগস্ট:
দেশে মাদকের ছড়াছড়ি, কর্মসংস্থান সংকটে তরুণ সমাজ, একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার খবর, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক সংকটে নাভিশ্বাস—এমন বাস্তবতায় সরকার এগিয়ে যাচ্ছে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার পথে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি জে-১০সিই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির নেগোসিয়েশন বৈঠকের মাধ্যমে খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য তা সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় শুধু যুদ্ধবিমান নয়। এর সঙ্গে রয়েছে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি বা ড্রোন সিস্টেম সংগ্রহের উদ্যোগও। চলতি অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্রয়প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। তা না হলে বিষয়টি আগামী বাজেটে নেওয়া হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জে-১০সিই চতুর্থ প্রজন্মের একটি আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অভিজ্ঞতাও এ ধরনের যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তে বিবেচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপের রাফাল বা ইউরোফাইটার টাইফুনের মতো যুদ্ধবিমানের তুলনায় চীনের তৈরি যুদ্ধবিমানের দাম তুলনামূলক কম। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে জে-১০সিইর দিকে এগোচ্ছে।
কিন্তু এখানেই উঠছে অন্য প্রশ্ন।
দেশে যখন মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন মাদকবিরোধী লড়াইয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী? তরুণদের একটি অংশ যখন চাকরির বদলে অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘুরছে, তখন নতুন কর্মসংস্থানের জন্য বড় কোনো পরিকল্পনা কোথায়? জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে বিভিন্ন কারখানা যখন উৎপাদন কমাচ্ছে বা বন্ধ হচ্ছে, তখন শিল্প বাঁচাতে সরকারের অগ্রাধিকার কী?
গ্যাস না পেয়ে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন সমস্যায়, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে যখন প্রশ্ন, তখন যুদ্ধবিমান অবশ্য আকাশে উড়বে।
একদিকে মাটিতে কারখানার চিমনির ধোঁয়া কমছে, অন্যদিকে আকাশে যুদ্ধবিমানের ধোঁয়ার রেখা টানার প্রস্তুতি চলছে।
রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আধুনিক বিমানবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে তাই প্রশ্ন তোলা মানেই প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বিরোধিতা নয়। প্রশ্ন হলো—দেশের সীমিত অর্থ ও সম্পদের ব্যবহারে এখন সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকার কোনটি?
দেশের মানুষ হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
চাকরি চাইলে কি জে-১০সিই পাওয়া যাবে?
গ্যাসের লাইনে দাঁড়ালে কি অ্যাটাক হেলিকপ্টার আসবে?
বন্ধ কারখানার শ্রমিক কি ইউএভি সিস্টেম পরিচালনার চাকরি পাবেন?
আর মাদক থেকে তরুণদের বাঁচাতে রাষ্ট্র কি যুদ্ধবিমানের মতোই আধুনিক কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে?
সরকার বলছে, জনগণের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতেই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনগণ হয়তো এখন পাল্টা প্রশ্ন করছে—জনগণকে শুধু শত্রুর আক্রমণ থেকে নয়, ক্ষুধা, বেকারত্ব, মাদক, অপরাধ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেও রক্ষা করার পরিকল্পনাটা কবে আকাশে উড়বে?
কারণ দেশের আকাশ পাহারা দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিমান প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ পাহারা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন চাকরি, নিরাপদ সমাজ, সচল কারখানা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি এবং মাদকমুক্ত তরুণ প্রজন্ম।
আকাশের নিরাপত্তা জরুরি—কিন্তু মাটির মানুষ বাঁচানো তার চেয়েও জরুরি নয় কি?