বাংলাদেশ সংবাদ

উৎপাদনের আগেই ৩ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা, তিন বছর পিছিয়ে স্টিল প্রকল্প

উৎপাদনের আগেই ৩ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা, তিন বছর পিছিয়ে স্টিল প্রকল্প

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৬ আগস্ট:

উৎপাদনে যাওয়ার আগেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বিএমএসআইএল) বৃহৎ স্টিল প্রকল্পে। প্রায় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকা।

শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রকল্পটি পিছিয়েছে অন্তত তিন বছর। ২০২৪ সালের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়ার কথা থাকলেও এখন সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সব জটিলতা কাটলে ২০২৭ সালের শেষ দিকে কারখানাটি চালু হতে পারে।

মিরসরাইয়ের প্রায় ৭০ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই কারখানার বছরে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার কথা। উৎপাদন শুরু হলে সরাসরি প্রায় ৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে আরও বিপুল মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি আসে আমদানি করা যন্ত্রপাতি নিয়ে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতি ২৭৫টি কনটেইনারে দেশে এলেও দীর্ঘ সময় বন্দরে আটকে থাকে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, ব্যাংকিং ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এসব কনটেইনার সময়মতো খালাস করা যায়নি। এতে বন্দর ও শিপিং-সংক্রান্ত ড্যামেজ, কনটেইনার ডিটেনশনসহ বিভিন্ন ব্যয় বাড়তে থাকে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, এ খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের সুদ ও অন্যান্য ব্যয় প্রকল্পের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।

২০২২ সালে প্রকল্পের জন্য এলসি খোলার সময় ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা। পরবর্তী সময়ে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ফলে বিদেশি যন্ত্রপাতির মূল্য পরিশোধে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ কারণে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত দায় তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পটির অর্থায়নে অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আট ব্যাংকের কনসোর্টিয়াম ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ অনুমোদন করে। তবে এখন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর কাছেই রয়েছে।

এদিকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির ঋণের সুদ ও আবগারি শুল্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিতরণ করা সিন্ডিকেটেড ঋণের ওপর ২৪৬ কোটি এবং ফোর্সড লোনের ওপর ৬১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিএমএসআইএল এ পর্যন্ত প্রায় ৪১১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। তবে উৎপাদন শুরু না হওয়ায় প্রকল্পটি এখনো আয় সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে ঋণের বোঝা ও বাড়তি ব্যয় সামলাতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

শুধু ব্যাংকিং ও বন্দর জটিলতাই নয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের অবকাঠামো নিয়েও প্রকল্পটিকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের দাবি। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ইউটিলিটি অবকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব অর্থে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে প্রায় ২৫০ কোটি, গ্যাসে ৪০ কোটি এবং পানির লাইনে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

প্রকল্পটির পরিকল্পনা ছিল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদন করা। সংশ্লিষ্টদের আশা, কারখানাটি চালু হলে এসব পণ্যের আমদানি কমবে এবং দেশীয় স্টিল শিল্পে নতুন সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় শিল্প প্রকল্পে সময়মতো ব্যাংকিং সেবা, বন্দর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সংযোগ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগের খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। একটি প্রকল্পের বিলম্ব তখন শুধু উদ্যোক্তার ক্ষতি করে না; এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, ব্যাংক ঋণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

বিএমএসআইএল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রকল্পে তৈরি হওয়া প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিজনিত প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা, বন্দর ও কনটেইনার-সংক্রান্ত প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা, ব্যাংকের সুদ ও আবগারি শুল্ক বাবদ প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকা এবং ইউটিলিটি অবকাঠামোতে অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগের পরিমাণ ও সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের বিচারে এটি শুধু একটি শিল্পকারখানা নয়—দেশের স্টিল শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় উদ্যোগ। কিন্তু নীতিগত জটিলতা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, এলসি-সংক্রান্ত সমস্যা, বন্দর ব্যয় এবং অবকাঠামোগত বিলম্বের কারণে প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়েছে।

এখন প্রকল্পটির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত অবশিষ্ট জটিলতা কাটিয়ে উৎপাদনে যাওয়া। কারণ প্রতিটি অতিরিক্ত দিন প্রকল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘসূত্রতা বাড়াচ্ছে ঋণের চাপ এবং কমিয়ে দিচ্ছে বিনিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা।

শিল্প খাতের জন্য এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তাই একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে—দেশে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের পথে ব্যাংকিং, বন্দর, জ্বালানি ও নীতিগত বাধাগুলো সময়মতো সরানো।