ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে হ্যাঁ বা না ভোট: কিসে ভোট দিলে কি হবে ?
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। ভোটাররা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের জন্য চারটি মূল প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেন। সরকারের প্রচারণা এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বানে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হচ্ছে। গণভোটে হ্যাঁ জয় পেলে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব সংসদে বাধ্যতামূলক হবে; না জিতলে সনদ কার্যকর হবে না।
১. হ্যাঁ ভোট দিলে কী হবে?
সংবিধান ও আইন
- ৮৪টি সংস্কার বাধ্যতামূলক হবে (৪৭ সাংবিধানিক, ৩৭ আইন/নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে)।
- রাষ্ট্রভাষা বাংলা; অন্যান্য মাতৃভাষাও স্বীকৃত হবে; নাগরিক পরিচয় ‘বাংলাদেশি’।
রাষ্ট্র ও ক্ষমতার ভারসাম্য
- রাষ্ট্রপতি গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন।
- প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত; একাধিক পদে থাকতে পারবেন না।
- জরুরি অবস্থা ঘোষণায় মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধী দলের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক; মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে।
বিচার ও নিয়োগ
- প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হবেন আপিল বিভাগের বিচারক থেকে।
- ন্যায়পাল ও কমিশনের নিয়োগে বিরোধী দল অংশ নেবে।
- সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত।
সংসদ ও নির্বাচন
- একক কক্ষ থেকে দ্বিকক্ষ সংসদ; উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন ভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী।
- ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত।
- এমপিরা বাজেট ও আস্থাবিল ব্যতীত স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে।
নাগরিক অধিকার ও প্রশাসন
- সকল সম্প্রদায়ের সমন্বয়, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার সংবিধানে।
- নতুন অধিকার: ইন্টারনেট নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা।
- প্রশাসন ও আইন প্রণয়নে সংস্কার: নতুন প্রশাসনিক বিভাগ, ফৌজদারি তদন্ত সেবা, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, আইনজীবীর আচরণবিধি, ডিজিটালাইজেশন।
ফায়দা
- জনগণ: মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত, নির্বাচন ও বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা।
- সরকার: দীর্ঘ মেয়াদে সংবিধান অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন ও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলায় স্থিতিশীলতা।
২. না ভোট দিলে কী হবে?
সংবিধান ও আইন
- জুলাই সনদ কার্যকর হবে না; বর্তমান সংবিধান ও নিয়মাবলী বজায় থাকবে।
ক্ষমতার ভারসাম্য
- প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমাহীন; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতা বর্তমান নিয়মেই থাকবে।
- জরুরি অবস্থায় ক্ষমতার একপক্ষীয় ব্যবহার অব্যাহত থাকবে।
বিচার ও নিয়োগ
- প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে।
- ন্যায়পাল ও কমিশনের নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নেই।
সংসদ ও নির্বাচন
- একক কক্ষ সংসদ; উচ্চকক্ষ বা ডেপুটি স্পিকার ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন নেই।
- এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে না।
নাগরিক অধিকার ও প্রশাসন
- নতুন অধিকার (ইন্টারনেট নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা) কার্যকর হবে না।
- সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হবে না।
জনগণ ও সরকারের প্রভাব
- জনগণ: মৌলিক অধিকার সীমিত, স্বাধীনতা কম।
- সরকার: নতুন সংস্কার কার্যকর করা যাবে না; প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলায় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত।
সুতরাং বোঝা গেল যে, ভোটাররা কি বর্তমান সরকারের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ভোট দেবেন, নাকি নিজের বিবেচনা ও স্বতঃস্ফূর্ত মতানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ সরকারি কর্মকর্তারা ভিডিও বার্তা দিয়ে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বা স্বাধীন ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করবে না, যদি ভোটাররা স্বাধীনভাবে নিজের বিবেচনায় ভোট দিতে পারেন। অর্থাৎ ভোটের শেষ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ভোটারের নিজের হাতে। সরকার বা বিশেষ কোনো পক্ষের মতামত শুধুমাত্র তথ্য ও প্রচারণার অংশ, ভোটারকে বাধ্য করার বিষয় নয়।
সুতরাং ভোটের শেষ সিদ্ধান্তে ভোটারের স্বাধীনতা অপরিবর্তনীয়, এবং এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি। সরকারের ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা থাকলেও, ভোটার নিজস্ব বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী ভোট দিতে পারে—এটাই সত্যিকারের গণতন্ত্রের পরিচয়।