কলিকালের কলধ্বনি  ।। ৬৫ ।। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবকে আরও গতিশীল করার জন্য কিছু সুপারিশ

কলিকালের কলধ্বনি  ।। ৬৫ ।। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবকে আরও গতিশীল করার জন্য কিছু সুপারিশ

উৎসর্গ


সদ্য অনুষ্ঠিত লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের বিজয়ী ও বিজিত—উভয় দলের প্রতিটি সদস্যকে
আপনাদের সৌহার্দ্য, প্রতিযোগিতার চেতনা ও পারস্পরিক সম্মান আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে

বিলাত তথা বাংলাদেশের বাইরে বাংলা সাংবাদিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাশীল সংগঠন ‘লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব’-এর দ্বিবার্ষিক সভা ও নির্বাচন গত পঁচিশে জানুয়ারি সম্পন্ন হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে যাঁরা বিজয়ী হয়েছেন, তাঁদের সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন। একই সঙ্গে যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয়ী হতে পারেননি, তাঁদের প্রতিও রইল অকৃত্রিম সম্মান ও শুভেচ্ছা।

একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক সংগঠনের সৌন্দর্য এখানেই—ভিন্নমত থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই সংগঠনের বৃহত্তর স্বার্থেই কাজ করবেন। ১৯৯৩ সাল থেকেই এভাবেই চলে আসছে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব।

লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব এখন ৩৩ বছরের তরতাজা যুবক। বিগত দিনগুলোতে এই সংগঠনকে দাঁড় করাতে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের সকলের প্রতি ক্লাবের সবাই কৃতজ্ঞ। তাঁদের সবার প্রতি আমাদের প্রাণখোলা শুভেচ্ছা ও সম্মান।

আজকের কলামে ক্লাবের অধিকতর উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে কিছু সুপারিশ রাখতে চাই—ক্লাবের দীর্ঘদিনের পুরোনো সদস্য হিসেবে। আশা করি সদ্য বিজয়ী নতুন কমিটি এসব সুপারিশ বিবেচনা করে সদস্যদের অধিকতর সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

মূলত আজকের সুপারিশগুলো আমার মাথা থেকে প্রথমবার বেরোচ্ছে—তা নয়। আমি এ সংগঠনকে ভালোবাসি এবং চাই সংগঠনটি উত্তরোত্তর আরও সমৃদ্ধ হোক। এসব সুপারিশের সঙ্গে ক্লাবের বর্তমান ৩৩৫ জন সদস্যের অনেকেই হয়তো একমত পোষণ করবেন, আবার কেউ কেউ দ্বিমতও পোষণ করতে পারেন। এ সুপারিশগুলো সম্পূর্ণ আমার একান্ত নিজস্ব। সংগঠনের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি বা কাউকে বিপদে ফেলার উদ্দেশ্যে নয়। আশা করি সদ্য বিজয়ীরা বিষয়টি সুদৃষ্টিতে বিবেচনা করে তাঁদের প্রথম মিটিংয়েই এসব বিষয়ে পর্যালোচনা করবেন।

এ লেখাটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কমিটির সমালোচনা নয়; বরং লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবকে আরও কার্যকর, সৃজনশীল ও যুগোপযোগী সংগঠনে রূপান্তরের লক্ষ্যে কিছু বাস্তবসম্মত সুপারিশ মাত্র। ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা আমার এই সুপারিশগুলো ন্যায্য ও যুক্তিসংগত মনে করেন, আশা করি তাঁরা অন্তত লেখালেখির মাধ্যমে গ্রুপে এর প্রতিফলন ঘটাবেন।

. নির্বাচনী সংস্কার ফি যৌক্তিকীকরণ

কোনো নন-প্রফিট সংগঠনে উচ্চ অঙ্কের ফি দিয়ে পদপ্রার্থী হওয়ার তেমন যৌক্তিকতা নেই। যেমন ক্লাবে প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি পদে নির্বাচন করতে হলে বড় অঙ্কের নন-রিফান্ডেবল ফি দিতে হয়, যা অনেকের এক মাসের রোজগারের সমান। এরপর নির্বাচিত হলে পরবর্তী দুই বছর বিনা পারিশ্রমিকে প্রচুর সময় দিতে হয়।

ব্রিটেনের মানুষ যেখানে রুটি-রুজির জন্য চাকরি-বাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে সারাক্ষণ ব্যস্ত,আর বাংলাদেশের মানুষ যেদেশে সবচেয়ে দরিদ্র,সেখানে একটি ক্লাবের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে পাঁচ/সাত শত পাউন্ড নন-রিফান্ডেবল ফি বে-মানান বৈকি। হয়তো আমি বা অনেকেই সেটা বহন করতে সক্ষম। কিন্তু সবাই তো সক্ষম না-ও হতে পারেন। এছাড়া, যেখানে ক্লাবের জন্য পরের দুই বছর ফ্রি সেবা দিতে হবে। সুতরাং চড়া ফি দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হলে প্রত্যাশিত মানের কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ব্রিটেনের মতো দেশে ফুল টাইম আট ঘন্টা চাকুরি, বা ব্যবসা করে, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের সময় দেবার পর আর হাতে সময় থাকার কথা নয়। এরপরও যাঁরা নিজের গাঁটের পাউন্ড খরচ করে চ্যারিটি কাজ করবেন, সেহেতু অতিরিক্ত ফি আদায় অবিচার বৈকি। সম্ভব হলে এসব কাজের সাথে জড়িতদের নামকাওয়াস্তে হলেও সম্মানী দেওয়া দরকার।

অনেকে বলবেন, ফান্ড রেইজিংয়ের জন্য এসব বড় অঙ্কের ফি ধার্য করা হয়েছে। কিন্তু সংগঠনটি এখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তাছাড়া ব্রিটেনে এ ধরনের মানসম্পন্ন সংগঠনের জন্য বিভিন্ন মূলধারার সংস্থা থেকে ফান্ড সংগ্রহ করাও খুব কঠিন নয়।

তাই আমার প্রস্তাব—প্রতিটি পদের ফি ১০০ থেকে ২০০ পাউন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হোক। পাশাপাশি দুই প্যানেলের সঙ্গে স্বতন্ত্র তৃতীয় প্যানেলের সুযোগ রাখলে নির্বাচন আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।

. নির্বাচনী প্রচারণার শৃঙ্খলা

নির্বাচনের মৌসুমে ভোটারদের বারবার ফোন করে বিরক্ত করার সংস্কৃতি পরিহার করা উচিত। এর বদলে একদিনে সম্মিলিত পরিচিতি সভার আয়োজন করা যেতে পারে। এরপর ক্লাবের গ্রুপে প্রত্যেক প্রার্থীর ছবি ও পরিচিতি সর্বোচ্চ তিনবার পোস্ট করার নীতিমালা করা যেতে পারে।

. লন্ডনের বাইরে বসবাসকারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব

ক্লাবের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য লন্ডনের বাইরে বসবাস করেন। তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে লন্ডনের বাইরের অঞ্চল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, সহ-সেক্রেটারি ও সহ-ট্রেজারার—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য একজন করে সংরক্ষিত আসন রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি লন্ডনে বসবাসরতদের মধ্য থেকে ঐসব পদে একজন করে অবশ্যই থাকবেন মূল দায়িত্বে। বাইরের পদবীধারীগণ দরকার হলে অনলাইনে ক্লাবের মিটিং-এ  যোগদান করবেন। করোনার ফলে তো আজকাল অনেক জরুরী মিটিং তো অনলাইনে জুমে হচ্ছে।

. প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা

অনলাইন মিটিং, ডিজিটাল আর্কাইভ, লাইভ স্ট্রিমিং ও অনলাইন ভোটিং চালু করলে ক্লাবের কার্যক্রম আরও আধুনিক ও গতিশীল হবে।

. প্রশিক্ষণ পেশাগত উন্নয়ন

সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, ফ্যাক্ট-চেকিং ও ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন জরুরি। এতে নবীন ও অভিজ্ঞ—উভয়ধারার সাংবাদিক উপকৃত হবেন।

. নতুন পদ সৃষ্টি

সাহিত্য সম্পাদক, সহ-সাহিত্য সম্পাদক, নাট্য ও শিল্পকলা সম্পাদক, খেলাধুলা সম্পাদকসহ প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি করে সদস্যদের ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

. সাহিত্য প্রকাশনা কার্যক্রম

বছরে অন্তত একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ করা যেতে পারে, যেখানে সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও লেখা পাঠাতে পারবেন।

. গ্রন্থ প্রকাশ উদ্যোগ সেরা গ্রন্থকার পুরস্কার

ক্লাবের সদস্যদের কাছ থেকে পান্ডুলিপি আহ্বান করে ক্লাবের উদ্যোগে বই প্রকাশ করা যেতে পারে। প্রতি বছর সেরা গ্রন্থকারকে পুরস্কৃত করলে নবীন-প্রবীণ লেখকদের লেখালেখির আগ্রহ বাড়বে।

. নাট্য শিল্পকলা কার্যক্রম

সদস্যদের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করা ও শিল্পকর্মের প্রদর্শনী আয়োজন ক্লাবকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করবে। বছরে অন্তত একবার হলেও সদস্যদের অংশগ্রহণে নাটক মঞ্চস্থ করা যেতে পারে। নাটক লেখা, পরিচালনা, মঞ্চসজ্জা, লাইটিং, অভিনয়সহ সব কাজে ক্লাবের সদস্যরাই যুক্ত থাকবেন।

এ ছাড়া প্রতি মাসে বা প্রতি তিন মাসে একবার আবৃত্তি, গান, কৌতুক ইত্যাদি দিয়ে ঘরোয়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।

১০. খেলাধুলা অন্যান্য কার্যক্রম

বছরজুড়ে বিভিন্ন খেলাধুলার প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ক্যারাম ও দাবার পাশাপাশি বিতর্ক, সাধারণ জ্ঞান ও অন্যান্য জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। সেই সাথে এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সাংবাদিকদের ছেলেমেয়ের নিয়েও করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

১১. অ্যাওয়ার্ড প্রদান সংক্রান্ত

এবারের মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রদানকে স্বাগত জানাই। তবে যাঁরা নিয়মিত ও মানসম্মত নিউজ, কলাম, ফিচার, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখছেন, তাঁদের মধ্য থেকে বিচারকরা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বাছাই করে পুরস্কার দিতে পারেন। কারণ অনেকে নিজেরা নমিনেশন দিতে সংকোচবোধ করেন। যাঁরা এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ তাঁদেরকে বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে। যেমন, যে বা যাঁরা সারা জীবন ধরে ফিচার, কলাম, প্রবন্ধ, নিউজ ইত্যাদি নিজে লিখেছেন (অন্যকে দিয়ে নয়) তাঁদের মতো অভিজ্ঞজনদের বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া দরকার। 

১২. অবকাঠামো জনবল

ক্লাবের বর্তমান অফিসের পরিসর আরও বাড়ানো দরকার। কারণ ৩৩৫ জন সদস্যের মধ্যে বর্তমান অফিসে মাত্র ৩৫/৪০ জনের ভাল করে চেয়ার পেতে বসার স্থান সংকুলান হয়। এখানে যেসব কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে সেসব বাস্তবায়ন করতে হলে আরও বড় পরিসরের অফিস দরকার। প্রয়োজনে বড় হল ভাড়া করা যেতে পারে। সম্মানীভিত্তিক কিছু জনবল ও একজন অ্যাডমিন অফিসার নিয়োগ করলে প্রশাসনিক কাজ আরও সুসংগঠিত হবে।

১৩. ফান্ড সংগ্রহ আর্থিক শক্তিশালীকরণ

Awards for All-এর মতো দাতাসংস্থা ও অনুদানপ্রদায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে ফান্ড সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

১৪. মিডিয়া সরকারি সংযোগ জোরদারকরণ

ব্রিটেনের মূলধারার মিডিয়া ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করা প্রয়োজন।

১৫. উপদেষ্টা পরিষদ

৩৩৫ জন সদস্যের মধ্য থেকে যোগ্য ১১ জনকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যেতে পারে। প্রতি তিন মাস অন্তর বৈঠকের মাধ্যমে কমিটিকে পরামর্শ দিলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।

এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও সম্মানজনক সাংবাদিক সংগঠনে পরিণত হবে—এই প্রত্যাশাই রইল।

 লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬।