বিশ্বব্যাংকে ব্রিটেনের জলবায়ু কূটনীতি, সরাসরি নেতৃত্বে এড মিলিব্যান্ড

বিশ্বব্যাংকে ব্রিটেনের জলবায়ু কূটনীতি, সরাসরি নেতৃত্বে এড মিলিব্যান্ড

ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ২৭  জুলাই: 

বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট ও দরিদ্র দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তাকে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। তিনি নিজেই বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সাধারণত এই দায়িত্ব কোনো জুনিয়র মন্ত্রী বা সরকারি কর্মকর্তার হাতে দেওয়া হলেও এবার সরাসরি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ভূমিকা পালন করবেন। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি—বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কাঠামোয় পরিবর্তন এবং জলবায়ু মোকাবিলায় আরও বেশি বিনিয়োগ—এসব বিষয়ে ব্রিটেন সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায় বলে মনে করা হচ্ছে।

মিলিব্যান্ড, যিনি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকারে আগে এনার্জি ও নেট জিরো বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন, বলবেন—আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়; বরং এটি এর মূল ভিত্তি।

তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাংকে যুক্তরাজ্যের গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আমি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই যে, উন্নয়ন ও জলবায়ু নেতৃত্বে ব্রিটেন তার বৈশ্বিক ভূমিকা পালনে গুরুতরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

ইউরোপজুড়ে জলবায়ু বিপর্যয়ের মধ্যেই নতুন পদক্ষেপ

মিলিব্যান্ডের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউরোপ ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস অঞ্চলে আগুন নিয়ন্ত্রণে সামরিক সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে।

অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু এলাকায় খরার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পানির ব্যবহার সীমিত করতে কয়েকটি এলাকায় হোসপাইপ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। জুন মাসে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শস্য উৎপাদন খাতে প্রায় ২০০ কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে মিলিব্যান্ডের বিশ্বব্যাংক ভূমিকা গ্রহণকে অনেকেই জলবায়ু ইস্যুতে ব্রিটেনের নতুন কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু নীতি নিয়ে চাপ

বিশ্বব্যাংক বর্তমানে বড় ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়নের অগ্রাধিকার কমানোর চাপ এসেছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তাদের মোট অর্থায়নের ৪৫ শতাংশ জলবায়ু সম্পর্কিত খাতে দেওয়ার লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ লর্ড নিকোলাস স্টার্ন মিলিব্যান্ডের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকে ব্রিটেনের নেতৃত্ব বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।

তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্ব জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন ও জলবায়ু এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

দরিদ্র দেশগুলোর জন্য নতুন আশার বার্তা?

আফ্রিকার জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহামেদ আদো বলেন, এখন মূল বিষয় হবে ব্রিটেন বিশ্বব্যাংকের প্রভাব ব্যবহার করে জলবায়ু অভিযোজন ও সংকট মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলোকে কীভাবে সহায়তা করে।

তিনি বলেন, “সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলো এমন একটি সংকটের জন্য যেন আরও ঋণের বোঝায় না ডুবে যায়, যে সংকট তৈরিতে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে কম।”

তার মতে, যদি মিলিব্যান্ডের এই নিয়োগ বিশ্ব জলবায়ু ও উন্নয়ন নেতৃত্বে ব্রিটেনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, তাহলে আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল বিশ্ব তা স্বাগত জানাবে।

তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

মিলিব্যান্ডকে দায়িত্ব নিতে হবে এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটেনের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমছে।

স্টারমার সরকার ব্রিটেনের বৈদেশিক সহায়তা মোট জাতীয় আয়ের ০.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৩ শতাংশ করেছে। এর আগে লেবার সরকারের সময় এই হার ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

এছাড়া জলবায়ু অর্থায়নেও কাটছাঁট হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সময়কালের জন্য নির্ধারিত ১১.৬ বিলিয়ন পাউন্ডের অর্থায়ন কমিয়ে বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন পাউন্ড করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিলিব্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—বক্তৃতার বাইরে গিয়ে ব্রিটেনের সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যেও বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যবস্থায় কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারেন।

কারণ জলবায়ু সংকট এখন আর শুধু পরিবেশের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অভিবাসন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবিক সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আর সেই লড়াইয়ে ব্রিটেন কতটা নেতৃত্ব দিতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।