‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৪।। দেশে গিয়ে খাবো কি?
উৎসর্গ—
যারা ভালোবেসে প্রবাসীদের পাতে খাবার তুলে দেন,
অথচ জানেন না সেই খাবারের ভেতর কী আছে।
‘মা, আব্বু কি মারা যাচ্ছেন?’
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে তানিশার প্রশ্নে তার মা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
কেবল মেয়েকে শক্ত করে বুকের সঙ্গে চেপে ধরলেন। বললেন, ছি:, মা, ওসব বলতে নেই। একটু পরে তোমার বাবা ভাল হয়ে যাবেন। কিচ্ছু হয়নি উনার।
সামনের কেবিনে তখন অক্সিজেনের সাহায্যে শুয়ে আছেন তানিশার বাবা আহমেদ জামান। পাশের বেডে বড় ভাই মোহাম্মদ জামান। আরেক কক্ষে মা সুলেখা খাতুন, বয়স ৭৪ বছর। একটু দূরে স্ত্রী আজমেরি জামান। পরিবারের আটজনের কেউই তখন আর স্বাভাবিক নেই। যদিও মা দেশেই থাকেন। ওরা সাতজন লন্ডন থেকে বেড়াতে গিয়েছেন নিজ শহর সিলেটে। এর মধ্যে প্রায় সবাই খাবার খেয়ে অসুস্থ্য।
কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা ভাবছিলেন—দেশ থেকে লন্ডনে ফেরার বিমান ধরবেন গ্রীষ্মের ছুটি পুরো শেষ করে। তারা থাকেন লন্ডনের আইল অব ডগসে, টেমস নদীর পারে।
এখন মনে হচ্ছে, বিমান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন তো?
অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও এই পরিবারটি বাংলাদেশে এসেছিল অন্য এক স্বপ্ন নিয়ে। এখন সফর সংক্ষিপ্ত করে ফিরে যাবার চেষ্টায় আছেন। এর জন্য অবশ্য টিকেট বদলাতে বেশ কিছু বাড়তি খরচও করতে হবে। কিন্তু উপায় নেই।
দেশে আসার আগে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন সবাই খুব মজা করে দেশীয় খাবার খাবেন। মায়ের হাতের রান্না খাবেন। আত্মীয়দের বাড়িতে দাওয়াত খাবেন। মা নাতিনদের সাখে খুনসুটি করবেন।
লন্ডনে বসে যেসব খাবারের কথা মনে পড়ত। জামান সাহেব ও তার স্ত্রী আজমেরি প্রায়ই দেশীয় খাবার নিয়ে গল্প করতেন। রীতিমতো লিস্ট বানিয়ে নিয়ে এসেছেন আজেমেরী। দেশে এসে সেসব খাবারই খুঁজে খুঁজে খাচ্ছিলেন তারা।
ইলিশ মাছ।
গরুর মাংস। খাসির রান।
মিষ্টি।
ফল।
ফুচকা।
চা।
গ্রামের দুধ।
আর বাড়ির রান্না করা ভর্তা-ভাজি।
প্রথম কয়েকদিন ছিল উৎসব।
তারপর শুরু হলো অসুখ।
একজনের পেট ব্যথা।
দুজনের বমি।
কারও ডায়রিয়া।
কারও মাথা ঘোরা।
কারও শরীর এত দুর্বল হয়ে গেল যে বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না।
প্রথমে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।
‘খাবারের পরিবর্তন হয়েছে, তাই এমন হচ্ছে।’
‘অনেক দিন পর দেশে এসেছ, শরীর অভ্যস্ত না।’
‘দুদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
কিন্তু দুদিন পরও কেউ ঠিক হলো না।
বরং অসুস্থ হয়ে পড়লেন একে একে আটজনই গত ১৫ দিনেই। অতচ পুরো গ্রীষ্মকালটা দেশেই কাটানোর ইচ্ছে ছিল ওদের। বাচ্চারাও দেশের নৌকা, সিলেটের প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই পছন্দ করে। বিশেষ করে ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক ওদের খুব পছন্দ। তানিশা যখন সুস্থ্য ছিল তখন ফেরিওয়ালাদের ডাক নকল করে ইংরেজি উচ্চারনে বাংলায় বলেতো..লােগবো নি...খসির মাংশ.. সবজি...। যদিও গরম আর মশার যন্ত্রনায় অস্থির ছিল সবাই। তবুও মানিয়ে নিয়েছিল ওরা। এদিকে বারবার কারেন্ট চলে যাচ্ছে। অবশ্য ওদের ঘরে আপিএস লাগানো থাকায় খুব একটা ঝামেলায় পড়তে হয়নি।
খাবারের খোঁজে নামল পরিবার
হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের একজন সদস্য সিদ্ধান্ত নিলেন—কী খেয়ে সবাই অসুস্থ হলো, সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
সেদিনের পর থেকে শুরু হলো এক অদ্ভুত অনুসন্ধান।
প্রথমেই এল মাছের পালা।
পরিবারের সবাই ইলিশ ভালোবাসে। দেশে এসে প্রথম সপ্তাহেই বড় একটি ইলিশ কিনে রান্না হয়েছিল।
খোঁজ নিতে গিয়ে তারা জানতে পারল, বাজারে মাছ সংরক্ষণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মাছের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নও কম নয়।
পরিবারের সদস্যটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘তাহলে ইলিশও বাদ?’
কেউ উত্তর দিল না।
এরপর এল দুধ।
গ্রামের আত্মীয় বাড়ি থেকে গরুর দুধ এসেছিল।
শিশুরা আনন্দ করে দুধ খেয়েছিল।
কিন্তু দুধের মান নিয়েও নানা সময়ে ভেজাল ও দূষণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
মা তখন বললেন,
‘তাহলে বাচ্চাদের আমরা কী দেব?’
ঘরে নেমে এলো নীরবতা।

মিষ্টির বাক্স খুলেও শান্তি নেই
এরপর তারা গেল মিষ্টির দিকে।
দেশে এসে আত্মীয়দের বাড়ি গেলে মিষ্টি ছাড়া কি আর চলে?
রসগোল্লা, সন্দেশ, দই—সবই ছিল তাদের পছন্দের তালিকায়।
কিন্তু মিষ্টির রং, সংরক্ষণ এবং নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগের খবর পাওয়া যায়।
মেঝো ছেলে সাফওয়ান হেসে বললেন,
‘লন্ডনে থাকলে দেশি মিষ্টি, দই খেতে মন চাইত। দেশে এসে এখন মিষ্টির নাম শুনলেই ভয় লাগছে।’
হাসিটা অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না।
ফলের ঝুড়িতেও প্রশ্ন
আমের মৌসুম।
বাড়িতে বড় বড় আমের ঝুড়ি।
শিশুরা বলল,
‘আমরা আম খাব।’
কে তাদের আটকাবে?
কিন্তু আম পাকানো ও ফল সংরক্ষণে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগের কথা শুনে পরিবারের একজন বললেন,
‘এই আমগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে?’
কেউ জানে না।
কেউ পরীক্ষা করেনি।
তখনই প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে গেল—
যে খাবারটি আমরা ভালোবেসে খাচ্ছি, সেটি নিরাপদ কি না—তা জানার সুযোগ কি আমাদের আছে?
ফুচকার সামনে দাঁড়িয়ে শিশুটির প্রশ্ন
কদিন আগে ঢাকায় ঘুরতে গিয়ে শিশুরা ফুচকা খেতে চেয়েছিল।
‘এক প্লেট করে দেবেন?’
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মা একটু ইতস্তত করলেন।
তারপর সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আচ্ছা, খাও।’ বলতে না বলতেই একটা বাস প্রায় ওদের উপর উঠেই পড়ছিল। ভয়ে টান দিয়ে বাচ্চাদের কোনমতো সরিয়ে এনছিলেন। দেশে এই আরেক সমস্যা-রাস্তাঘাট, সড়ক কোনটাই নিরাপদ নয়। তার উপর ছিনতাই তো আছেই।
কয়েকদিন পর যখন সবাই অসুস্থ, তখন সেই ফুচকার পানির কথাও মনে পড়ল।
খোলা খাবার, অপরিষ্কার পানি, হাতের পরিচ্ছন্নতা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হলো।
শিশুটি মাকে বলল,
‘মা, ফুচকাও কি খারাপ?’
মা এবার কোনো উত্তর দিলেন না।
তারপর এল সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন—প্লাস্টিক
পরিবারের একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রথমবারের মতো শুনলেন মাইক্রোপ্লাস্টিক শব্দটি।
অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।
এত ছোট যে অনেক সময় চোখে দেখা যায় না।
পানি, পরিবেশ এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে—এমন প্রমাণ ও গবেষণা রয়েছে। খাবার ও পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। তবে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
কথাটা শুনে পরিবারের কর্তা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
‘মানে আমরা যে খাবার খাচ্ছি, তার মধ্যে এমন কিছু থাকতে পারে যা চোখেই দেখা যায় না?’
চিকিৎসক বললেন,
‘সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু আপনারা যে অসুস্থ হয়েছেন, তার কারণ মাইক্রোপ্লাস্টিক—এটা পরীক্ষা ছাড়া বলা যাবে না।’
কথাটা সত্যি।
কিন্তু পরিবারের ভয় তখন যুক্তির চেয়েও বড়।
কারণ তারা ইতিমধ্যে খাবারের একের পর এক গল্প শুনেছে।
মাছে ভেজাল।
দুধে ভেজাল।
মিষ্টিতে ভেজাল।
ফলে ভেজাল।
খোলা খাবারে ভেজাল।
পানিতে ভেজাল।
আর এখন প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা নিয়েও ভেজাল।
‘তাহলে আমরা কী খাব?’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে পরিবারের একজন বললেন,
‘দেশে এসে এতদিন পর একটা জিনিস বুঝলাম—খাবার শুধু রান্না করলেই খাবার নিরাপদ হয় না।’
পাশ থেকে আরেকজন বললেন,
‘আমরা লন্ডনে বসে দেশের খাবারের জন্য কাঁদি।’
‘আর দেশে এসে খাবার খেয়ে হাসপাতালে?’
কেউ হাসল না।
কারও মুখে কথা নেই।
কারণ খাবারের সঙ্গে যে স্মৃতি জড়িয়ে ছিল, সেই খাবারই এখন তাদের কাছে আতঙ্কের নাম।
ফেরার দিন
অবশেষে চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলো সবাই। তবু বমি চলছিল। এদিকে বারবার টয়লেটে যেতে হচ্ছিলো।
ফিরতি বিমানের দিন এলো।
বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে মা রান্নাঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
চুলার পাশে রাখা হাঁড়ি।
টেবিলে ফল।
ফ্রিজে মাছ।
শেলফে বিস্কুট।
সবকিছুর দিকে তাকালেন তিনি।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
‘এই খাবারগুলোর কোনটা সত্যি নিরাপদ?’
কেউ উত্তর দিল না।
লন্ডনে ফেরার বিমানে শিশুটি জানালার পাশে বসে মাকে বলল,
‘মা, আমরা কি আবার বাংলাদেশে আসব?’
মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
‘হয়তো আসব, হয়তো না। এখন ঠিক বলতে পারছি না’। ভাবছেন ‘দেশে এসে খাবো কি?’
মেয়েটি বললো, আর আসাটা বোধ হয় ঠিক হবে না। আমরা বরং দাদীকে লন্ডনে নিয়ে যাবো আমাদের কাছে।
কিন্তু তোমার দাদী তো দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চান না । জবাব দিলেন মেয়েটির মা আজমেরি জামান।
‘আমরা দাদীেকে অনেক ফ্রেশ আম খেতে দেবো। দাদী তো আম ভালবাসেন।’
মা এবার মৃদু হাসলেন।
কিন্তু সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে রইল একটা ভয়—
পরেরবার যদি দেশে আসলে সন্তানদের কী খাওয়াবেন? সব খাদ্য কি তাহলে লন্ডন থেকে নিয়ে আসা যাবে? সেটাও-বা কি করে সম্ভব? এখন বিমানে যা কড়াকড়ি। সব খাবার তো দেশে নিয়ে যেতে দেবে না।
কারণ ভেজাল শুধু খাবারের স্বাদ নষ্ট করে না। মন ও শরীরটাও নষ্ট করে দেয়।
বিমানে উঠে জামান সাহেব বেশ কয়েকবার নিজে এবং মেয়েকে নিয়ে টয়লেটে গেলেন। সিটে এসে বসে ভাবছেন-
‘ভেজাল’ মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে। তাহলে কি দেশের সব মানুষগুলোর মধ্যে ভেজাল ঢুকে গেছে? তাও-বা কিভাবে সম্ভব? তাহলে দেশটা চলছে কিভাবে? নিশ্চয়ই ভাল মানুষ এখনও আছে। কিন্তু এত অল্প ভালো মানুষ দিয়ে কি আঠারো/বিশ কোটির দেশটা এভাবে চলতে পারে? ওরা নিজে নিজে ঠিক না হলে আমাদের প্রবাসীদের কিই-বা আর করার আছে, মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠানো ছাড়া...এসব ভাবতে ভাবতে চোখে তন্দ্রা এসে ভর করলো জামান সাহেবের চোখে। বিমান তখন সিলেটের আকাশ পেরিয়ে অনেক দূর চলে এসেছে..
লন্ডন, ২৩ আগস্ট ২০২৬।