ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ইউরোপে আগুনের তাণ্ডব: তাপপ্রবাহের আগে নিয়ন্ত্রণে মরিয়া ফ্রান্স-স্পেন
ইউরোপ প্রতিনিধি, ২৮ জুলাই:
ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের অগ্নিনির্বাপক বাহিনী এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। কারণ চলতি সপ্তাহেই আবারও শুরু হতে যাচ্ছে নতুন তাপপ্রবাহ, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা বলেছেন, সোমবার ও মঙ্গলবারের সময়টিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বুধবার থেকে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে আগুন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
স্পেনে মাদ্রিদের পশ্চিমে আভিলা অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে পড়া আগুন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানলে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। রাজধানী মাদ্রিদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দুটি বড় অগ্নিকাণ্ড মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর এলাকা আগুনে ধ্বংস হয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ (Gironde) এলাকায় ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে আগুনের গতি আরও বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, জিরন্দের আগুন অত্যন্ত তীব্র ও অনিশ্চিত আচরণ করছে। আগুন নিজস্ব বাতাস তৈরি করে দিক পরিবর্তন করছে এবং বোর্দো শহরের আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এই দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর বন ও প্রাকৃতিক এলাকা পুড়ে গেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগুনের কারণে ফ্রান্সে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। লঁদ (Landes) অঞ্চলের আরেকটি আগুন আপাতত নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

বোর্দো সফরে গিয়ে ম্যাক্রোঁ বলেন, “আগামী কয়েক সপ্তাহ কঠিন হতে যাচ্ছে। আমাদের ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।”
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, চলতি বছর দাবানলের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় কমিশনের জলবায়ু বিষয়ক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় আগুন নভেম্বর পর্যন্ত জ্বলতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর ফ্রান্সে জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টরের বেশি বন ও উদ্ভিদ এলাকা পুড়ে গেছে। গত পুরো বছরেও এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর। স্পেনে এ বছর প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ছয় গুণ বেশি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জলবায়ু সম্মেলনে বলেছেন, এসব দাবানল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু সংকটের ভয়াবহ প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “আগুন এখন আর ব্যতিক্রম নয়, এটি নিয়মে পরিণত হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দাবানলের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। ইউরোপীয় কমিশন আগামী অক্টোবরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নতুন অভিযোজন কৌশল প্রকাশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ডেইলি ভয়েস অব পিপল-এর বিশ্লেষণ:
ইউরোপের এই আগুন শুধু কয়েকটি দেশের সংকট নয়, এটি পুরো বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়—তার প্রভাব আজকের বাস্তবতা।