ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশে গ্যাসের চাপে থমকে যাচ্ছে শিল্প: অর্ধেক সক্ষমতাতেও চলছে না কারখানা
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৮ জুলাই:
বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলে এখন নতুন আতঙ্কের নাম গ্যাস সংকট। গত এক সপ্তাহ ধরে তীব্র হওয়া এই সংকটে দেশের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও মেশিন চলছে ধীরগতিতে, কোথাও পুরো ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে একদিকে কমছে উৎপাদন, অন্যদিকে বাড়ছে লোকসানের বোঝা।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক কারখানা তাদের স্বাভাবিক সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে না, তৈরি পণ্যের মান নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকট
দেশের অন্যতম বড় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকায় গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
শিল্প মালিকদের দাবি, যেখানে একটি কারখানা স্বাভাবিকভাবে চালাতে ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক জায়গায় বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
সাভার ও আশুলিয়ার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্প-কারখানাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডায়িং, স্টিল, সিরামিক ও কাগজ শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
রপ্তানি নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা
উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘ হলে শুধু উৎপাদন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের রপ্তানি খাতও। সময়মতো পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, ক্রয়াদেশ বাতিল, জরিমানা এবং আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি শিল্প খাত অর্থায়ন ও নিরাপত্তা সমস্যার মধ্যেও রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
কারিগরি সমস্যায় কমেছে ৪৫০ এমএমসিএফডি সরবরাহ
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকট শুধু সাময়িক সমস্যার ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শিল্পখাতকে রক্ষায় সরকারের একটি কার্যকর নীতি প্রয়োজন। কারখানা বন্ধ করে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না।
‘রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়’
এদিকে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে দুটি এফএসআরইউ দিয়ে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এর সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত গ্যাস আমদানি করা সম্ভব নয়। ফলে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
শিল্প উদ্যোক্তাদের দাবি, সাময়িক ব্যবস্থা নয়, এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা। কারণ গ্যাস সংকট শুধু কারখানার সমস্যা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।