হেপাটাইটিসের উচ্চঝুঁকিতে বাংলাদেশ: দেশে আক্রান্ত প্রায় এক কোটি, নীরব সংকটে লাখো পরিবার
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৮ জুলাই:
বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এখনো রয়েছে বড় ঝুঁকির মধ্যে। হেপাটাইটিস-বি ও সি ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেশে প্রায় এক কোটি। এর মধ্যে শুধু হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই রোগ দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল হেপাটাইটিস রিপোর্ট ২০২৬-এ বাংলাদেশকে হেপাটাইটিস-বি জনিত মৃত্যুর উচ্চঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, ঘানা, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম—এই ১০ দেশে বিশ্বের মোট হেপাটাইটিস-বি জনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৯ শতাংশ ঘটে।
বিশ্বে প্রতিদিন হেপাটাইটিস-বি ও সি ভাইরাসে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ৪ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ। বছরে এ সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। ২০২৪ সালে এই দুই ভাইরাসে মারা গেছেন ১৩ লাখ ৪০ হাজার মানুষ।
বাংলাদেশে নীরব সংক্রমণ
হেপাটোলজি সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে হেপাটাইটিস-বি ও সি আক্রান্ত প্রায় এক কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৭ লাখ পুরুষ, ২৮ লাখ নারী এবং চার লাখ শিশু রয়েছে। দেশের প্রায় ১৫ লাখ পরিবারে অন্তত একজন হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত রোগী রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের লিভার রোগের বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে হেপাটাইটিস-বি। এ ভাইরাসের কারণে দেশে অ্যাকিউট হেপাটাইটিসের ৩৫ শতাংশ, ক্রনিক হেপাটাইটিসের ৭৫ শতাংশ, লিভার সিরোসিসের ৬০ শতাংশ এবং লিভার ক্যান্সারের ৬৫ শতাংশ হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী প্রায় ২৫ লাখ কর্মক্ষম মানুষ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত। অথচ শুধু ভাইরাস পজিটিভ হওয়ার কারণে অনেক সময় চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়।
টিকা কমিয়েছে ঝুঁকি, তবে লক্ষ্য এখনো দূরে
বাংলাদেশ ২০০৩ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে হেপাটাইটিস-বি টিকা যুক্ত করে। এর ফলে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৯৮৪ সালে দেশে হেপাটাইটিস-বি সংক্রমণের হার যেখানে ছিল প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫ দশমিক ১ শতাংশে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর থেকে বিশ্বে হেপাটাইটিস-বি-এর নতুন সংক্রমণ ৩২ শতাংশ এবং এ রোগে মৃত্যু ১২ শতাংশ কমেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হারও কমেছে।
তবে ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছে, বর্তমান গতিতে এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।
শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস-বি ও সি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে হেপাটাইটিস-বি আক্রান্তদের মাত্র ৫ শতাংশেরও কম চিকিৎসার আওতায় রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বড় সমস্যা হলো—অনেক মানুষ জানেন না যে তারা আক্রান্ত। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেকে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা জাতীয় পর্যায়ে স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাদান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
চিকিৎসকদের মতে, হেপাটাইটিস নিয়ে সমাজে এখনো নানা ভুল ধারণা রয়েছে। একসঙ্গে খাওয়া, হাত মেলানো বা আলিঙ্গনের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় না। আক্রান্ত রক্ত, অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক, একই সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার এবং মা থেকে নবজাতকের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। সময়মতো পরীক্ষা, টিকা এবং আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তাদের মতে, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস নির্মূলের পথে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—আক্রান্তদের খুঁজে বের করা, চিকিৎসার আওতায় আনা এবং রোগটি নিয়ে ভয় ও সামাজিক বৈষম্য দূর করা। তাহলেই ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ।