ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ডিএনএ বলছে, বাংলাদেশিদের পূর্বপুরুষের যাত্রা আফ্রিকা থেকে
তথ্য কণিকা ডেস্ক, ২৮ জুলাই:
মানুষের ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা নেই, আমাদের শরীরের ভেতরেও লুকিয়ে আছে সেই গল্প। বিজ্ঞানীরা এখন ডিএনএ (DNA) বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানতে পারছেন—মানুষ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক তথ্যের মাধ্যমে মানুষের অতীত জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যকে নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ছিল কঠিন। আধুনিক জেনেটিক গবেষণা সেই কাজকে অনেক সহজ করেছে। জীবাশ্ম থেকে পাওয়া প্রাচীন ডিএনএ এবং বর্তমান মানুষের জিন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মানবজাতির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি করছেন।
ডিএনএ কীভাবে ইতিহাস ধরে রাখে?
ডিএনএ হলো জীবদেহের একটি বিশেষ ধরনের জৈব নির্দেশিকা, যেখানে শরীর গঠন ও পরিচালনার প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকে। মানুষের প্রতিটি কোষে থাকা এই ডিএনএতে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি ক্ষুদ্র গাঠনিক উপাদান রয়েছে।
কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএর কপি তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া খুবই নিখুঁত হলেও মাঝে মাঝে ছোটখাটো ভুল বা পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনকে বলা হয় মিউটেশন। কোনো মিউটেশন যদি প্রজনন কোষে ঘটে, তাহলে তা পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
হাজার হাজার বছর ধরে জমে থাকা এসব মিউটেশন বিজ্ঞানীদের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক ইতিহাসের বইয়ের মতো কাজ করে। ডিএনএতে থাকা পরিবর্তনের ধরন দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন—মানুষের পূর্বপুরুষ কখন কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল এবং কোন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের মিল রয়েছে।
সব মানুষের শিকড় আফ্রিকায়
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বর্তমান পৃথিবীর সব মানুষ প্রায় দুই লাখ বছর আগে আফ্রিকায় বসবাসকারী একটি প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর উত্তরসূরি।
আফ্রিকার মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জেনেটিক বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। এর অর্থ হলো, মানবজাতির সবচেয়ে পুরোনো শিকড় আফ্রিকাতেই রয়েছে।
প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে ছোট ছোট মানবগোষ্ঠী পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কেউ ইউরোপের দিকে যায়, কেউ এশিয়ার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ স্থানীয় পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়।
বাংলাদেশের মানুষের ডিএনএতে বহু ইতিহাসের মিশ্রণ
বাংলাদেশের মানুষের জিনগত ইতিহাসও অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। গবেষণা বলছে, আধুনিক বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ডিএনএতে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পূর্বপুরুষদের জিনগত প্রভাব রয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গীয় বদ্বীপ বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর চলাচল ও মেলবন্ধনের জায়গা ছিল। নদী, বন্যা, কৃষিনির্ভর জীবন এবং ঘনবসতি বাংলাদেশের মানুষের জিনগত বৈশিষ্ট্য তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
জিনের সঙ্গে রোগের সম্পর্ক
মানুষের পরিবেশ শুধু তার সংস্কৃতিকে নয়, শরীরকেও প্রভাবিত করেছে। হাজার হাজার বছর ধরে খাদ্যের অভাব, দুর্ভিক্ষ ও কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে মানুষের শরীরে কিছু জিনগত পরিবর্তন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অতীতে খাদ্য সংকটের সময়ে শরীরে শক্তি সঞ্চয় করার ক্ষমতা বেঁচে থাকার জন্য সহায়ক ছিল। কিন্তু বর্তমানে যখন সহজলভ্য খাবার, বিশেষ করে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবারের পরিমাণ বেড়েছে, তখন সেই একই জিনগত বৈশিষ্ট্য ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশিদের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি দেখা যায়। বিশ্বে প্রথম হার্ট অ্যাটাকের গড় বয়স যেখানে সাধারণত ৬৫ বছরের বেশি, বাংলাদেশে তা প্রায় ৫২ বছরের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তাই ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।

ডিএনএ জানাচ্ছে আমাদের পরিচয়
ডিএনএ গবেষণা শুধু মানুষের অতীত খুঁজে বের করছে না, এটি আমাদের পরিচয়ের নতুন ব্যাখ্যাও দিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের জিনগত ইতিহাস দেখায়—আমরা যেমন বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তেমনি আমাদের রয়েছে নিজস্ব একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ডিএনএতে লুকিয়ে থাকা আরও অনেক অজানা ইতিহাস ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সামনে আসবে।
মানুষের ইতিহাস এখন শুধু মাটির নিচে থাকা জীবাশ্মে নয়, আমাদের শরীরের ভেতর থাকা ডিএনএর মধ্যেও লেখা আছে।