হরমুজ ইস্যুতে ট্রাম্পের আরও ১০ দিনের সময়

হরমুজ ইস্যুতে ট্রাম্পের আরও ১০ দিনের সময়

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ২৭ মার্চ:

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়িয়েছেন। নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা “খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে”।

বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ইরান সরকারের অনুরোধে তিনি আপাতত “এনার্জি প্ল্যান্ট ধ্বংসের সময়সীমা” ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখছেন। তবে তার ভাষায়, “ভুয়া সংবাদমাধ্যমের প্রচারণা সত্ত্বেও আলোচনা ইতিবাচক পথে রয়েছে।”

পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও জানান, ইরান প্রথমে সাত দিনের সময় চাইলেও তিনি ১০ দিনের সুযোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি আগেভাগেই বিজয়ের দাবি করে বলেন, “এক অর্থে আমরা ইতোমধ্যেই জিতে গেছি।”

এর আগে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, প্রায় এক মাস ধরে চলা এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে আলোচনায় না এলে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর আরও হামলা চালানো হবে। এই হুমকির মধ্যেই ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরিসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে।

একই সময়ে ইসফাহান ও বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এলাকায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের “সমঝোতার জন্য ইরান অনুরোধ করছে” এমন দাবিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে তেহরান। বরং তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে। তেল আবিব, জেরুজালেমসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে দিনভর বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে—স্থায়ীভাবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করে নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার।” তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “তারা যদি তা না করে, তাহলে আমরা তাদের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন।”

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, আলোচনার সদিচ্ছা হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে ১০টি তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বহু শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বেও পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের নৌবাহিনী “অপ্রতিরোধ্য পতনের পথে” এগোচ্ছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার পেছনে তাংসিরি সরাসরি জড়িত ছিলেন।

এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতাও থেমে নেই। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৫ দফা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যা সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির ভিত্তি হতে পারে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই প্রস্তাবকে “একতরফা ও অন্যায্য” বলে মন্তব্য করেছেন।

ইরানের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার স্বীকার করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক থাকায় দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সংঘাত ইতোমধ্যে বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানে মৃতের সংখ্যা ১,৯০০ ছাড়িয়েছে, লেবাননে নিহত হয়েছেন প্রায় ১,১০০ জন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ। ইসরায়েলেও প্রাণহানি ঘটেছে।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করে, তাহলে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের হামলা শুরু হতে পারে।

সব মিলিয়ে, সময় বাড়ানোয় সাময়িক স্বস্তি এলেও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং কূটনীতি ও সামরিক উত্তেজনা—দুই পথেই পরিস্থিতি এগোচ্ছে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে।