দগ্ধ দেহাংশের স্তূপে চাপা পড়া মানবতা: কলকাতার উপকণ্ঠে গুদাম অগ্নিকাণ্ডে অশনাক্ত ২১ দেহাংশ, নিখোঁজ ২৭
কোলকাতা প্রতিনিধি আরশাদ আলী, ২৯ জানুয়ারি: কোলকাতার উপকণ্ঠ আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় পাশাপাশি দুটি গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর যেন মৃত্যু আর নিখোঁজের অন্ধকারে ডুবে গেছে গোটা অঞ্চল। গত দুই দিনে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ২১টি দেহাংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। দেহাংশগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে এখনো পর্যন্ত কোনো মৃতের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ২৭ জন, যাদের পরিবারের সদস্যরা থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছেন।
রোববার গভীর রাতে নাজিরাবাদের একটি ডেকরেটরস গুদাম এবং পাশের একটি মোমো ও কোমল পানীয় প্রস্তুতকারী কারখানায় একযোগে আগুন লাগে। অভিযোগ, ওই সময় ডেকরেটরসের গুদামে কর্মীরা পিকনিক করছিলেন এবং মোমো কারখানায় চলছিল স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম। দুই গুদামেই বিপুল পরিমাণ দাহ্য সামগ্রী মজুত থাকায় আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মোমো কারখানা থেকেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তবে মোমো প্রস্তুতকারী সংস্থা দাবি করেছে, আগুনের সূত্রপাত পাশের ডেকরেটরস গুদাম থেকে।
বারুইপুরের পুলিশ সুপার শুভেন্দ্র কুমার বুধবার সন্ধ্যায় জানান, উদ্ধার হওয়া ২১টি দেহাংশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছ থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। বুধবার পর্যন্ত ২৭ জনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৌম্যজিৎ বড়ুয়ার নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ফরেনসিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা শুরু করেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর দুই গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাস পলাতক থাকলেও মঙ্গলবার গভীর রাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ধৃত গঙ্গাধর দাস পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি এলাকার বাসিন্দা এবং দীর্ঘ চার দশক ধরে ডেকোরেটরস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি দাবি করেছেন, মোমো কারখানা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
ঘটনার পর গুদাম এলাকায় নিহত ও নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারি হৃদয়বিদারক চিত্র তৈরি করেছে। অনেক পরিবার এখনো প্রিয়জনের কোনো খোঁজ না পেয়ে দিশেহারা। অভিযোগ উঠেছে, দুই গুদামেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড মানা হয়নি।
এই ঘটনায় পুলিশ ও দমকল বিভাগ পৃথকভাবে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় অব্যবস্থা ও চরম নিরাপত্তা গাফিলতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে মোমো প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘ওঁয়াও মোমো’ তাদের গুদামে নিহত তিনজনের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকার প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
নাজিরাবাদের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অব্যবস্থা ও অবহেলার নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।