কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৬ ।। ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট: একটি কমিউনিটি, একটি প্রয়োজন, একটি রাষ্ট্রীয় দায়
উৎসর্গ:
নর্থ ইংল্যান্ডের সেই সব প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্দেশে—যাদের চোখে আজও দেশের টান, আর বুকের ভেতর লাল–সবুজের অটুট ভালোবাসা।

ম্যানচেস্টার–সিলেট সরাসরি ফ্লাইট স্থগিতের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে যে গভীর হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা কেবল একটি রুট বন্ধ হওয়ার প্রতিক্রিয়া নয়। এটি বহু বছরের আন্দোলন, প্রতীক্ষা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবাসীদের আবেগী সম্পর্কের ওপর এক নির্মম আঘাত।
এই রুট চালু হওয়া ছিল নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল। সিলেট অঞ্চলের মানুষের জন্য এটি কখনোই বিলাসিতা ছিল না—ছিল প্রয়োজন। অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানো, শেষ বিদায়ের জানাজায় পৌঁছানো, জরুরি চিকিৎসা কিংবা আকস্মিক পারিবারিক বিপর্যয়ে দ্রুত দেশে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল এই সরাসরি ফ্লাইট। দীর্ঘ কর্মজীবনের ক্লান্তি নিয়ে প্রবাসীরা যখন দেশে ফেরেন, তখন এই রুট তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দিত।
কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বুকিং সিস্টেমে হঠাৎ করেই এই ফ্লাইটটি আর দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই। ফলে হাজারো যাত্রীর কেনা টিকিট, সাজানো ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত আজ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঝুলে আছে।
এই উদ্বেগ যে শুধু কমিউনিটির ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ মিলেছে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে। গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও নর্থ ওয়েস্ট অঞ্চলের আটজন এমপি যৌথভাবে বিমানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি দিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশনারকেও বিষয়টি অবহিত করেছেন। তাঁদের স্পষ্ট ভাষ্য—ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য একটি অত্যাবশ্যক যোগাযোগ মাধ্যম।
এদিকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও ইউকে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। প্রতিনিধি দল লিখিত আবেদনে তুলে ধরেছেন—এই রুট বন্ধ হলে বয়স্ক যাত্রী, রোগী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী প্রবাসীদের ওপর ভয়াবহ মানবিক ও আর্থসামাজিক চাপ সৃষ্টি হবে।
সাক্ষাৎকালে প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত দাবিগুলো স্পষ্টভাবে উত্থাপন করা হয়—
এক. সিলেট–ম্যানচেস্টার রুটে অন্তত সপ্তাহে তিনটি সরাসরি ফ্লাইট দ্রুত পুনর্বহাল করতে হবে।
দুই. সিলেট–ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বন্ধের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
তিন. অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানি রোধে সরকারি কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
চার. প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিমান যোগাযোগ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
এই দুই প্রান্তের উদ্যোগ—ব্রিটিশ এমপিদের চিঠি এবং প্রবাসী রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ—একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়: এটি কোনো দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ইস্যু নয়, এটি একটি কমিউনিটির অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন।
এখানেই বড় প্রশ্নটি উঠে আসে—রাষ্ট্রের পতাকাবাহী বিমান কি কেবল লাভ-লোকসানের হিসাবের খাতায় চলবে, নাকি এটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের প্রতীকও হবে? যদি প্রবাসীদের সুবিধা, আবেগ ও প্রয়োজন উপেক্ষিত হয়, তবে “রাষ্ট্রীয় পতাকা” বহনের অর্থই বা কী থাকে?
আরেকটি বাস্তবতা হলো সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কথা শোনা গেলেও, যদি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটই টিকিয়ে রাখা না যায়, তবে সেই উন্নয়ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশীরা আজ ঐক্যবদ্ধ। নর্থ বাংলা প্রেসক্লাব ইউকের স্মারকলিপি, এমপিদের চিঠি, রাজনৈতিক প্রতিনিধি দলের বৈঠক—সব মিলিয়ে এটি একটি সম্মিলিত আর্তনাদ। এটি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ নয়; এটি এক গভীর ভালোবাসা থেকে উঠে আসা আবেদন।
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান নন। তারা এই দেশের সন্তান—যাঁরা হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলাদেশের পতাকাকে হৃদয়ে ধারণ করেন। ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট বন্ধ হলে কেবল একটি রুটই হারাবে না বাংলাদেশ; হারাবে প্রবাসীদের বিশ্বাস, ভরসা ও আবেগের একটি শক্ত সেতু।
এখনো সময় আছে। সিদ্ধান্ত বদলানো যায়। নর্থ ইংল্যান্ডের আকাশে লাল–সবুজের ডানাকে থামিয়ে দেবেন না। প্রবাসীদের চোখের জল নয়, তাদের স্বস্তি ও আশার কারণ হোক বাংলাদেশ সরকার।
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক
লন্ডন, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬