আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদন
বাংলাদেশে বাড়ছে ইয়াবার বিস্তার, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের তাগিদ
ডেস্ক রিপোর্ট, ভয়েস অব পিপল, ২৯ জুলাই:
বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেছে আয়ারল্যান্ডের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য আইরিশ টাইমস। পত্রিকাটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই সিন্থেটিক মাদকে দেশের লাখো মানুষ আসক্ত হয়ে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের বিস্তারের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেদনে ঢাকার এক ইয়াবা-আসক্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখতে ছদ্মনাম ব্যবহার করা ওই ব্যক্তি জানান, ইয়াবা তার স্বাভাবিক জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্থিতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, এই মাদক মানুষকে "মিথ্যা আত্মবিশ্বাস" দেয় এবং ধীরে ধীরে মানসিক ও শারীরিকভাবে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইয়াবার প্রভাবে একজন ব্যক্তি টানা কয়েক দিন জেগে থাকতে পারেন, এরপর দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকেন। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে স্ট্রোক, খিঁচুনি, দাঁতের ক্ষয় এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত। নতুন সিন্থেটিক ও আধা-সিন্থেটিক মাদকের বিস্তার এ সংকটকে আরও গভীর করছে। এ প্রেক্ষাপটে মাদক-সংশ্লিষ্ট কিছু অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইনও অনুমোদন করা হয়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আরিফুজ্জামানের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, সারা দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র কয়েক শ, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ফলে অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অনিশ্চয়তার মতো কারণও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত ব্যক্তিরা মাদকের অর্থ জোগাড় করতে নিজেরাই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সীমান্তবর্তী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চল এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড পরিমাণ মেথামফেটামিন জব্দ হয়েছে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রবেশ করা ইয়াবার বড় অংশই মিয়ানমার থেকে আসে।
দ্য আইরিশ টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক সচেতনতা, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কার্যকর পথ।