ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

দেশে সয়াবিন তেলেও মিলল উদ্বেগজনক মাইক্রোপ্লাস্টিক, শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি: গবেষণা

দেশে সয়াবিন তেলেও মিলল উদ্বেগজনক মাইক্রোপ্লাস্টিক, শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি: গবেষণা

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ২৯ জুলাই:  টুথপেস্টের পর এবার দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলেও মিলেছে উদ্বেগজনক মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্রতি লিটার তেলে গড়ে প্রায় ৫৪ হাজার ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রয়েছে। বিশেষ করে খোলা তেলে এই দূষণের মাত্রা বোতলজাত তেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত হয়েছে।

খোলা তেলে দূষণ বেশি

গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে মোট ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক পরীক্ষাগার পদ্ধতিতে বিশ্লেষণের পর দেখা যায়, প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে।

এর মধ্যে খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা পাওয়া গেছে, যা বোতলজাত তেলের তুলনায় অন্তত ১.২৪ গুণ বেশি। সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া গেছে তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলের নমুনায়।

গবেষকদের ধারণা, শিল্পকারখানার ঘনত্ব, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল শিল্পের আশপাশের পরিবেশ এবং একই পাত্র বারবার ব্যবহার করে খোলা তেল সংরক্ষণ ও বিক্রির কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েছে।

ছয় ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত

গবেষণায় তেলের নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে লো-ডেনসিটি ও হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিইথিলিন টেরেফথালেট, পলিইউরেথেন এবং নাইলন।

গবেষকদের মতে, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি বিশ্বে এই প্রথম কোনো গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে।

বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, মোট কণার ৮২.৫ শতাংশই আঁশ বা ফাইবারজাতীয় এবং অর্ধেকের বেশি স্বচ্ছ প্রকৃতির।

বছরে হাজারো প্লাস্টিক কণা শরীরে

গবেষণায় দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতে মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাব্য হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে।

তাতে দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৭টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি প্লাস্টিক কণা শরীরে গ্রহণ করতে পারে। গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, একটি শিশু তার জীবনদ্দশায় প্রায় ২১ লাখ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা দীর্ঘমেয়াদে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, শরীরে প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতির কারণ হতে পারে। ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো রক্তপ্রবাহেও প্রবেশ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

গবেষণা দলের প্রধান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন একটি উদীয়মান দূষক, যা মানুষের প্রজনন ও বিপাকীয় ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ জরুরি।

দ্রুত নীতিমালার দাবি

গবেষকেরা খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি, উন্নত মানের ফিল্টার ব্যবহারের পাশাপাশি খোলা তেল বিক্রির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

টুথপেস্টেও মিলেছিল একই দূষণ

এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায় দেশের বাজারে প্রচলিত ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছিল। শিশুদের ব্যবহারের জন্য তৈরি কয়েকটি টুথপেস্টেও এই দূষক পাওয়া যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ক্রমেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর তদারকি এবং সচেতনতা বাড়ানো সময়ের দাবি।