ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
ইউরোপের স্বপ্নে মৃত্যুর সাগর, তবু লিবিয়ার পথে বাংলাদেশি তরুণরা
ইউরোপ প্রতিনিধি, ২৯ আগস্ট:
ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নে বাংলাদেশি তরুণদের একটি অংশ এখনো বেছে নিচ্ছেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ। দালালের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া, সেখান থেকে ছোট নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি কিংবা গ্রিসে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন তারা।
কেউ সাগরে ডুবে মারা যাচ্ছেন, কেউ খাবার-পানির অভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন। অনেকে লিবিয়ার বন্দিশিবিরে নির্যাতনের শিকার হয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হচ্ছেন। আবার কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের কাছে তাদের আর কোনো খবরই পৌঁছাচ্ছে না।
তারপরও থামছে না এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগরের এই অনিয়মিত অভিবাসনপথে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই পথে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। ওই বছর ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছান।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। এ সময়ে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ইতালিতে এবং প্রায় ৩ হাজার ৬০০ জন গ্রিসে পৌঁছেছেন।
কয়েক দিনের যাত্রা, আজীবনের অপেক্ষা
এই পথের ভয়াবহতার সাম্প্রতিক উদাহরণ সুনামগঞ্জের কয়েক তরুণের ঘটনা।
গত মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার সময় একটি নৌকা ছয় দিন সাগরে ভেসে ছিল। নৌকায় থাকা যাত্রীদের খাবার ও পানি শেষ হয়ে যায়। পরে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আসে। তাদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বলে জানা যায়।
এর কয়েক মাস পর আগস্টে আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকায় ছিলেন ৪২ জন। তাদের ৩৮ জন বাংলাদেশি। মাঝসমুদ্রে নৌকাটি বিকল হয়ে যায়, শেষ হয়ে যায় জ্বালানি। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার পর অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়। পরে জীবিতদের একটি অংশ মিসরের উপকূলে পৌঁছালে উদ্ধার করা হয়।
কিন্তু উদ্ধার হওয়া মানেই সবার পরিবারের কাছে স্বস্তির খবর পৌঁছানো নয়। অনেকের এখনো নিখোঁজ থাকার খবর রয়েছে।
সুনামগঞ্জের হৃদয় পালও এমন নিখোঁজদের একজন। গ্রিসে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে দালালদের সঙ্গে তার পরিবারের ১৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় নেওয়া হয়।
৩১ জুলাই পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয় হৃদয়ের। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান নেই।
একই যাত্রায় থাকা সাব্বির হোসেন তালহার পরিবারের কাছেও এখন অনিশ্চয়তা। গ্রিসে পাঠানোর জন্য তার পরিবারের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছিল। নৌকা ছাড়ার আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বললেও পরে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
দালালের আশ্বাসের ওপর ভর করে পরিবারগুলো দিনের পর দিন অপেক্ষা করছে—কেউ বেঁচে আছেন কি না, সেটুকু জানার জন্য।
ইউরোপ নয়, আগে লিবিয়ার বন্দিশিবির
দালালদের কাছে ইউরোপ যাওয়ার পথটি যতটা সহজ করে তুলে ধরা হয়, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করা অনেক তরুণকে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। সেখানে তাদের একটি অংশকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয় ভূমধ্যসাগরে।
একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ইউরোপ যাওয়ার আশায় লিবিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশিদের বড় অংশই সেখানে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। বরং অনেকে বন্দিশিবিরে থাকার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
তাদের একটি বড় অংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেকের চলাফেরার স্বাধীনতাও ছিল না। খাবার ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটানো নিয়েও ছিল চরম অনিশ্চয়তা।
কখনো পরিবারকে ফোন করে বলা হয়েছে, টাকা না দিলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। মুক্তির জন্য পরিবারকে আবারও লাখ লাখ টাকা দিতে হয়েছে।
অর্থাৎ ইউরোপের স্বপ্নে যাত্রা শুরু করে অনেক তরুণের প্রথম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায় বন্দিত্ব, নির্যাতন ও ঋণের বোঝা।
এক দশকে মৃত্যু-নিখোঁজ দুই হাজারের বেশি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মিত অভিবাসনপথে দুর্ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৩২৯ বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ৮৫৯ জন বাংলাদেশি নিখোঁজ হয়েছেন।
অর্থাৎ এক দশকে এসব ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনপথে ২ হাজারের বেশি বাংলাদেশির মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে লিবিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে ইতালিমুখী ভূমধ্যসাগরীয় পথ। নথিভুক্ত মৃত্যু ও নিখোঁজের বড় অংশই এই রুটে ঘটেছে।
২০০৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি এই পথ ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
অন্যদিকে, গত ছয় বছরে লিবিয়া থেকে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
কারা যাচ্ছেন?
এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে তরুণদের।
ব্র্যাকের গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টাকারীদের বড় অংশের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জের পাশাপাশি মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও কুমিল্লার তরুণদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
কেন তারা এত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, বিদেশে উচ্চ আয়ের আকাঙ্ক্ষা, দালালদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং ইউরোপে পৌঁছানোর পর জীবন বদলে যাবে—এমন একটি ধারণা।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, গ্রামপর্যায়ে বৈধ ও নিরাপদ বিদেশযাত্রার সুযোগ এবং অবৈধ পথে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না পৌঁছানো।
শুধু প্রচার নয়, দরকার দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, শুধু সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে এই প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
তার মতে, বাংলাদেশের পাশাপাশি ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। পাচারকারীদের রুট, অর্থ লেনদেন ও যোগাযোগব্যবস্থা শনাক্ত করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে অভিযান চালানো প্রয়োজন।
কারণ একটি দালালচক্রের কার্যক্রম শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করে ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, লিবিয়া হয়ে ইউরোপ—পুরো পথজুড়েই একাধিক দেশের অপরাধী নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।
ফলে একটি দেশের আইন দিয়ে এই চক্র ভাঙা কঠিন।
সরকারের নজরে ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অবৈধভাবে বিদেশ পাঠানোর সঙ্গে জড়িত চক্র শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি জেলায় ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকার একই সঙ্গে কম খরচে বৈধ পথে দক্ষ কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর জন্য নতুন শ্রমবাজার তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—সচেতনতা ও অভিযান কতটা কার্যকর হবে?
কারণ একজন তরুণ যখন পরিবারের জমি বিক্রি করে কিংবা ঋণ করে ১২-২০ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দেন, তখন তাকে শুধু বিপদের কথা বললেই হয়তো সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব হবে না। তার সামনে বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার বাস্তব সুযোগও তৈরি করতে হবে।
ভূমধ্যসাগরের ঢেউ থেমে থাকবে না। কিন্তু সেই ঢেউয়ের মধ্যে আর কত বাংলাদেশি তরুণের জীবন হারাবে—এটি এখন শুধু অভিবাসনের প্রশ্ন নয়, জাতীয়ভাবে ভাবার মতো এক গভীর মানবিক সংকট।
ইউরোপের পথে যাওয়ার স্বপ্ন যদি জীবন কেড়ে নেয়, তবে সেটি আর স্বপ্ন থাকে না—পরিণত হয় একটি পরিবারের আজীবনের শোকে।