একটি বিশেষ কলাম।। “সিলেটি ভাষাকে কটাক্ষ নয়—জানুন এর ইতিহাস, স্বাতন্ত্র্য, নাগরি ঐতিহ্য ও প্রবাসী পরিচয়”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৫।। সিলেটি ভাষা: হাসির নয়, গর্বের
উৎসর্গ
সিলেটের সেইসব মা-বাবা, দাদা-দাদি ও নানা-নানিদের প্রতি—
যাঁদের মুখের ভাষায় আজও বেঁচে আছে সিলেটের মাটি, মানুষের গল্প ও শত বছরের স্মৃতি।
তাঁদের কণ্ঠস্বরেই বেঁচে থাকুক সিলেটি ভাষা।

‘কি..তা, ভাইসাব বালা..নি? কথাটা খুব সাধারণ। কেউ ‘সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায়’ কথা বলছেন। পাশ থেকে কেউ হেসে উঠলেন। আমি অনেক ‘অতি উচ্চশিক্ষিত’ বাংলাদেশিকে দেখেছি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে কটাক্ষ করেন, মজা করেন। অনেকে বলেন, সিলেটিরা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারেন না।
কিন্তু আমি তো নিজেই দেখেছি, বাংলাদেশের হাতেগোনা দুইচারজন ছাড়া, যারা যতই শুদ্ধ প্রমিত বাংলায় কথা বলুন না কেন, তাদের ‘আঞ্চলিক টাং’ এসেই যায়। যেমন চিটাগাং, নোয়াখালি, রংপুর, রাজশাহী, যশোহর, ময়মনসিং ইত্যাদি জেলা বা দেশের যে কোন জেলার বাসিন্দা আমার সাথে দুই মিনিট কথা বললেই আমি ধরতে পারি তিনি কোন জেলার মানুষ।
এমনকি ঠোট, চেহারা দেখেও বলে দিতে পারি কে, কোন জেলার বাসিন্দা। এমনকি শুধু দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখেও বলে দিতে পারি কে শহরের বা গ্রামের বাসিন্দা। আমার সাথে কথা বলার সময় দুই চারটি শব্দ উচ্চারণ করলেই বলে দিতে পারি, তিনি সিলেটের কোন উপজেলার বাসিন্দা। এমনকি শুধু নাম শুনেই বলে দিতে পারি তার স্বভাব চরিত্র কেমন প্রকৃতির।
আবার যুক্তরাজ্যের কে কোন অঞ্চলের বাসিন্দা, তা ওদের উচ্চারণ শুনেই ধরা যায়। আবার ইউরোপের সবাই তো দেখতে সাদা। ওদের গঠন ও উচ্চারণ শুনেই বলে দিতে পারি, কে, কোন দেশের মানুষ হতে পারেন।
এসব বেশিরাভাগ দেশে থাকতেই নিজে নিজে গবেষণা করে বের করেছি। আর কিছুটা গত প্রায় তিন দশকে বিলাতে বসবাস করে বের করেছি। অবশ্য সব সময় যে এসব শতভাগ সত্যি হয় এমন নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেছি সত্য হয়। মানুষকে ভালবেসে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েই এসব বের করেছি। তাই বলে কি প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের ভাষা বা স্বভাব নিয়ে কটাক্ষ বা হাসাহাসি করতে হবে? এসব প্রসঙ্গ এখানেই শেষ করি।
সুতরাং সিলেটিদের আলাদা উচ্চারণ বা টাং তো থাকতেই পারে। তাই বলে কি অবজ্ঞার চোখে তাদের দেখবেন কেউ কেউ?
তবুও মাঝে মাঝে শুনি, কেউ কেউ কখনো কখনো সিলেটি ভাষার উচ্চারণ নকল করে হাসাহাসি করেন। অনেক সেলিব্রেটির মুখে নিজেই শুনেছি। এদের নাম বলে বিব্রত করতে চাই না। কখনো বলা হয়—‘এটা আবার কেমন বাংলা!’ কখনো সিলেটি কথাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন এটি শিক্ষিত মানুষের ভাষা নয়, কেবল গ্রামের মানুষের কথাবার্তা। আর সিলেটিরা সঠিক উচ্চারণে কথা বলতে না পারায় ওরা বোধহয় পিছিয়ে পড়া মানুষ।
আমরা, সিলেটিরা হয়তো কথাগুলোকে নিছক মজা হিসেবেই দেখি। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানের চোখে বিষয়টি এত নিরীহ নয়।
কারণ কোনো মানুষের ভাষাকে ছোট করা মানে অনেক সময় তার পরিচয়, পরিবার, সংস্কৃতি ও শিকড়কেও ছোট করা।
সিলেটি ভাষাকে নিয়ে কটাক্ষ করার আগে তাই আমাদের একটু থামা দরকার।
এই ভাষার পেছনে যে দীর্ঘ ইতিহাস আছে, তার কতটুকুই বা আমরা জানি?
সিলেটি কি শুধু ‘ভাঙা বাংলা’?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
সিলেটি ভাষার ভাষাগত অবস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কেউ একে বাংলার একটি স্বতন্ত্র উপভাষা বা variety হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এর নিজস্ব ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার ও ঐতিহাসিক লিখিত ঐতিহ্যের কারণে আলাদা ভাষা হিসেবে বিবেচনা করেন।
কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম, সেটি হলো—সিলেটি সাধারণ প্রমিত বাংলার মতো করে উচ্চারিত বাংলা নয়।
এর নিজস্ব ধ্বনি-ব্যবস্থা আছে। শব্দের উচ্চারণের নিজস্ব নিয়ম আছে। ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য আছে। এমনকি ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণায় সিলেটির tonal features বা স্বরের ওঠানামার মাধ্যমে অর্থগত পার্থক্যের সম্ভাবনাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ সিলেটি ভাষা কোনো ‘ভুল বাংলা’ নয়।
একজন সিলেটি যখন সিলেটি বলেন, তিনি বাংলা ভুল করে বলছেন না। তিনি সিলেটি বলছেন।
এই পার্থক্যটি বোঝা খুব জরুরি।
একটি ভাষাকে হাসির বিষয় বানানো কতটা অন্যায় ?
আমাদের সমাজে প্রমিত বাংলাকে শিক্ষিত ও মার্জিত ভাষার প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে। প্রমিত বাংলা অবশ্যই আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, প্রশাসন, সাহিত্য ও গণমাধ্যমে এর প্রয়োজন অপরিসীম।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা মনে করি—প্রমিত বাংলার বাইরে থাকা সব ভাষা বা ভাষারূপ ‘নিম্নমানের’।
এটি ভাষাবিজ্ঞানের কোনো নিয়ম নয়।
সিলেটি নিয়ে সাম্প্রতিক সমাজভাষাবিজ্ঞানের গবেষণায়ও দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রচলিত ভাষাগত শ্রেণিবিন্যাস অনেক সময় সিলেটিকে ‘অশিক্ষিত বাংলা’ হিসেবে দেখায়। এই মনোভাব যুক্তরাজ্যের সিলেটি প্রবাসী সমাজেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনরুৎপাদিত হয়। SOAS-এর গবেষক Becky Winstanley-এর ২০২৫ সালের PhD গবেষণায় এই ভাষাগত hierarchy বা মর্যাদাক্রমের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
এখানেই আসল প্রশ্ন।
একজন মানুষ যদি ইংরেজি বলতে গিয়ে ভুল করেন, আমরা তাকে ভাষা শেখার সুযোগ দিতে চাই।
কিন্তু একজন সিলেটি তার নিজের ভাষায় কথা বললে কেন আমরা তাকে নিয়ে হাসব?

নাগরি লিপি—সিলেটের বিস্মৃত গর্ব
সিলেটি ভাষার ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো সিলেটি নাগরি লিপি।
এখানে আবার একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—নাগরি কোনো আলাদা ‘ভাষা’ নয়; এটি সিলেটি ভাষা লেখার ঐতিহ্যবাহী একটি লিপি।
এই লিপিতে পুঁথি লেখা হয়েছে। ধর্মীয় সাহিত্য, কাব্য, প্রেমের কাহিনি, নৈতিক শিক্ষা ও লোকজ সাহিত্য সংরক্ষিত হয়েছে।
সিলেটি নাগরি নিয়ে গবেষণার ইতিহাসও ছোট নয়।
ব্রিটিশ গবেষক David Kane সিলেটি নাগরি পুঁথির পাঠ ও পরিবেশন ঐতিহ্য নিয়ে SOAS, University of London-এ doctoral research করেন। তাঁর গবেষণার ফল হিসেবে ২০০৮ সালে Puthi-Poṛa: ‘Melodic Reading’ and its Use in the Islamisation of Bengal শিরোনামের doctoral thesis সম্পন্ন হয়। সিলেটি পুঁথি, নাগরি লিপি এবং পুঁথি পাঠের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কাজ।
অর্থাৎ আমরা যে ভাষা নিয়ে চায়ের টেবিলে হাসাহাসি করি, সেই ভাষার লিখিত ঐতিহ্য নিয়ে লন্ডনের একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়েছে, পিএইচডি হয়েছে।
এটুকু জানার পরও কি সিলেটি ভাষাকে ‘হাসির ভাষা’ বলা যায়?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পিএইচডি গবেষণা
সিলেটি ভাষা নিয়ে গবেষণা থেমে নেই।
SOAS University of London-এর গবেষক Becky Winstanley ২০২৫ সালে Sylheti Repertoires and Sociolinguistic Place-making in Tower Hamlets শিরোনামে PhD thesis সম্পন্ন করেন। গবেষণাটি Tower Hamlets-এর সিলেটি ভাষাভাষী মানুষের ভাষা ব্যবহার, পরিচয়, স্থান এবং সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে। গবেষণাটি Osmani Trust-এর সহযোগিতায় পরিচালিত হয়েছিল।
গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—সিলেটিকে শুধু একটি দূরবর্তী ‘দেশের ভাষা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। Tower Hamlets-এর সামাজিক জীবনেরও সিলেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষণায় সিলেটিকে একটি সক্রিয়, পরিবর্তনশীল এবং জীবন্ত linguistic practice হিসেবে দেখা হয়েছে।
ভাবুন একবার।
লন্ডনের Tower Hamlets নিয়ে একজন গবেষক পিএইচডি করছেন এবং গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে সিলেটি ভাষা।
আর আমরা সেই ভাষা নিয়ে অনেকেই হাসছি !
সিলেটি নাগরি আজ প্রযুক্তিরও বিষয়
সিলেটি নাগরিকে শুধু পুরোনো পুঁথির লিপি ভাবলে ভুল হবে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সিলেটি নাগরি নিয়ে Text-to-Speech (TTS) প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। গবেষকরা ১৫ ঘণ্টার বেশি অডিও এবং ৮,২৬৮টি বাক্য নিয়ে একটি Sylheti Nagri speech corpus তৈরি করেছেন। গবেষণাটির উদ্দেশ্য হলো বিপন্ন হয়ে পড়া নাগরি লিপির লিখিত ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা।
এখানে একটি চমৎকার বিষয় আছে।
গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, সিলেটি ভাষা কথ্য জীবনে এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও প্রাণবন্ত। কিন্তু সিলেটি নাগরি লিপি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
অর্থাৎ ভাষাটি এখনো মানুষের মুখে বেঁচে আছে; বিপদের জায়গাটি মূলত তার ঐতিহ্যবাহী লিখিত লিপি।
গবেষণায় নাগরি লিপিকে Unicode-এ U+A800–U+A82F পরিসরে অন্তর্ভুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সিলেটের পুরোনো লিপি এখন ডিজিটাল পৃথিবীর অক্ষরভাণ্ডারেরও অংশ।
আমরা যে লিপিকে হয়তো ভুলেই গেছি, কম্পিউটার প্রযুক্তি সেটিকে আবার বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
ভাষার সঙ্গে আত্মসম্মানের সম্পর্ক
একজন শিশুকে যদি বারবার বলা হয়—‘তোমার ভাষা হাস্যকর’, ‘এটা গ্রাম্য ভাষা’, ‘ভালোভাবে কথা বলতে হলে বাংলা বলতে হবে’—তাহলে একসময় সে নিজের ঘরের ভাষা নিয়েই সংকোচ বোধ করতে শুরু করতে পারে।
এটি শুধু ভাষার সমস্যা নয়।
এটি আত্মপরিচয়ের সমস্যা।
সিলেটি নিয়ে ২০২১ সালে The Daily Star-এ প্রকাশিত একটি লেখাতেও এই সামাজিক সংকোচের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছিল। সেখানে লেখক উল্লেখ করেন, শহুরে সামাজিক পরিবেশে আঞ্চলিক ভাষাগুলো কীভাবে জায়গা হারাচ্ছে এবং সিলেটি ভাষা নিয়ে ঠাট্টা করার অভিজ্ঞতা কীভাবে মানুষের মধ্যে নিজের ভাষা নিয়ে দ্বিধা তৈরি করে।
আর ২০২৬ সালের একটি সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের পরিচয় ও ভাষা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সিলেটি ভাষার বিরুদ্ধে সামাজিক মর্যাদাভিত্তিক ধারণার কথাও উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলাকে সামাজিক মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং সিলেটিকে তার নিচে অবস্থান করানো হয়।
এ ধরনের মানসিকতা শুধু সিলেটিদের জন্য ক্ষতিকর নয়।
এটি পুরো বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর।
সিলেটি বললে কি কেউ ‘কম’ বাঙালি হয়ে যায়?
একটি অদ্ভুত ধারণা আমাদের মধ্যে মাঝে মাঝে দেখা যায়—কেউ সিলেটি, চাটগাঁইয়া, বরিশাইল্যা, নোয়াখাইল্যা বা অন্য কোনো আঞ্চলিক ভাষায় কথা বললে যেন সে প্রমিত বাঙালিত্ব থেকে একটু দূরে সরে গেল।
এটি হাস্যকর।
বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যই তো বাংলাদেশের সৌন্দর্য।
ঢাকার বাংলা একরকম।
সিলেটের ভাষা আরেকরকম।
চট্টগ্রামের ভাষা আরেকরকম।
বরিশালের ভাষা আরেকরকম।
রাজশাহী, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ—প্রতিটি অঞ্চলের কথ্য ভাষায় রয়েছে নিজস্ব সুর, শব্দ ও ইতিহাস।
প্রমিত বাংলা আমাদের সবার যোগাযোগের একটি সাধারণ মাধ্যম হতে পারে।
কিন্তু মায়ের মুখের ভাষা কখনো পরীক্ষার খাতার ভাষা দিয়ে মাপা যায় না।
সিলেটি ভাষার সবচেয়ে বড় শক্তি—মানুষ
সিলেটি ভাষার সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অভিধান নয়, কোনো পুঁথি নয়, কোনো গবেষণাপত্রও নয়।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—মানুষ এখনো এই ভাষায় কথা বলে।
সিলেটের গ্রাম থেকে শহর, বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেন, লন্ডনের Whitechapel থেকে Tower Hamlets—সিলেটি মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাটিও ভ্রমণ করেছে। এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থারনত সিলেটিরা ঘরে বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে সিলেটি ভাষায় কথা বলেন। আজ পৃথিবীর প্রায় এমন কোন দেশ নেই যেখানে সিলেটিরা ছড়িয়ে পড়েননি এবং সিলেটি ভাষায় কথা বলছেন না। আজ সিলেটি আঞ্চলিক মৌলিক ভাষা সারা পৃথিবীতেই চলছে।
SOAS-এর সাম্প্রতিক গবেষণা সিলেটিকে Tower Hamlets-এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় এমনকি সিলেটিকে শুধু ‘হারিয়ে যাচ্ছে’—এই একমাত্র ধারণায় না দেখে এর জীবন্ত, পরিবর্তনশীল ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এটি আমাদের আশাবাদী করে।
কিন্তু আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীলও হতে হবে।
আমাদের কী করা উচিত?
প্রথম কাজ খুব সহজ।
সিলেটি ভাষায় কথা বলতে লজ্জা পাওয়া বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয় কাজ—নিজের সন্তানদের সঙ্গে সিলেটিতে কথা বলতে হবে।
তৃতীয় কাজ—সিলেটি ভাষার গল্প, গান, ছড়া, প্রবাদ, লোককথা ও পুঁথি সংগ্রহ করে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করতে হবে।
চতুর্থ কাজ—সিলেটি নাগরি শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
পঞ্চম কাজ—সিলেটি ভাষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরও গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে।
আর সবচেয়ে জরুরি কাজ—
সিলেটি ভাষাকে নিয়ে কটাক্ষ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
কারও উচ্চারণ শুনে হাসার আগে মনে রাখা উচিত, সেই উচ্চারণের পেছনে হয়তো তার মায়ের কণ্ঠ আছে, বাবার কণ্ঠ আছে, দাদির গল্প আছে, গ্রামের উঠান আছে, শৈশব আছে।
কোন আঞ্চলিক মুখের ভাষা নিয়ে হাসাহাসি করা একদম ঠিক নয়
একটি ভাষার কোনো উচ্চারণ আপনার কানে অপরিচিত লাগতেই পারে।
আপনি না বুঝতেই পারেন।
আপনার কাছে শব্দটি মজারও মনে হতে পারে।
কিন্তু তাই বলে সেটিকে উপহাস করার অধিকার আপনি পান না।
কারণ আপনার ভাষাও অন্য কারও কাছে অপরিচিত।
আজ আপনি সিলেটির উচ্চারণ নিয়ে হাসছেন। কাল অন্য কেউ আপনার আঞ্চলিক উচ্চারণ নিয়ে হাসবে।
এই হাসাহাসির শেষ কোথায়?
বরং আসুন আমরা উল্টো কাজটি করি।
সিলেটি ভাষাকে ভালোবাসি।
চাটগাঁইয়া ভাষাকে ভালোবাসি।
বরিশালের ভাষাকে ভালোবাসি।
নোয়াখালীর ভাষাকে ভালোবাসি।
বাংলার প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষার প্রতি সম্মান রাখি।
কারণ এগুলো পরস্পরের শত্রু নয়।
এগুলো মিলে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বিশাল সাংস্কৃতিক ভূগোল।
আর সিলেটি ভাষা সেই ভূগোলের একটি প্রাচীন, স্বতন্ত্র এবং অত্যন্ত প্রাণবন্ত অংশ।
আমার কাছে সিলেটি ভাষা শুধু একটি আঞ্চলিক ভাষা নয়।
এটি শিকড়ের ভাষা।
মায়ের ভাষা।
ঘরের ভাষা।
প্রবাসীর স্মৃতির ভাষা।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
এটি আমাদের ইতিহাসের জীবন্ত কণ্ঠস্বর।
সেই কণ্ঠস্বরকে নিয়ে হাসার আগে তাই একবার ভাবুন।
হয়তো আপনি যে শব্দটিকে নিয়ে হাসছেন, সেটিই কোনো এক বৃদ্ধ মায়ের কাছে তার জীবনের শেষ স্মৃতি।
তাই সবাই ভাষাকে সম্মান করুন। মানুষকে সম্মান করুন। নিজের শিকড়কে সম্মান করুন।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
১. Becky Winstanley, SOAS University of London
Sylheti Repertoires and Sociolinguistic Place-making in Tower Hamlets, PhD Thesis, 2025. গবেষণাটি Tower Hamlets-এর সিলেটি ভাষা, পরিচয়, সামাজিক ব্যবহার ও ভাষাগত মর্যাদাবোধ নিয়ে।
২. David Kane, SOAS University of London
Puthi-Poṛa: ‘Melodic Reading’ and its Use in the Islamisation of Bengal, doctoral thesis, 2008. সিলেটি নাগরি পুঁথি ও পুঁথি-পাঠের ঐতিহ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা।
৩. Simard, Dopierala & Thaut — SOAS Sylheti Project
সিলেটি ভাষার documentation, linguistic features, ভাষা-পরিচয় এবং সিলেটি নাগরি নিয়ে গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
৪. Saim, Ataullha; Paul, Soumik; Rahman, M. Shahidur (2026)
End-to-end variational speech synthesis for the endangered Sylheti Nagri language, Systems and Soft Computing, Vol. 8, 200496. সিলেটি নাগরি নিয়ে ১৫.৫ ঘণ্টার speech corpus এবং ৮,২৬৮টি utterance-ভিত্তিক প্রযুক্তিগত গবেষণা।
৫. SOAS University of London — Sylheti Project
সিলেটি ভাষা ও সিলেটি নাগরি সংরক্ষণ, গবেষণা ও শিক্ষার জন্য পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক উদ্যোগ।
৬. The Daily Star, “Lost in (Sylheti) Translation”, 2021
সিলেটি ভাষা নিয়ে সামাজিক সংকোচ ও আঞ্চলিক ভাষার প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের একটি সাংবাদিকতাভিত্তিক দলিল।
৭. Tower Hamlets and Southall: A new diaspora through language (2025)
ব্রিটেনে সিলেটি ভাষার সামাজিক অবস্থান, পরিচয় এবং ভাষাগত শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা।