চতুর্থ দিনে উদ্ধার অভিযান, ধ্বংসস্তূপে স্বজনদের খুঁজছেন হাজারো মানুষ; পুনর্গঠনে লাগতে পারে ৫ বিলিয়ন ডলার
নেপাল-তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা: নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার, মৃত ৬৭৬
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৯ আগস্ট:
হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে মানবিক বিপর্যয় ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দুর্যোগের চতুর্থ দিনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৬৭৬ জনে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পাথরের নিচে এখনও জীবিত মানুষ থাকার আশায় উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সীমান্ত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নেপালের ভোতে কোশি নদী অববাহিকা ও আশপাশের এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিব্বতের গিরং সীমান্ত এলাকাতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
নেপালে এখন পর্যন্ত ৬৬৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। তিব্বতে মারা গেছেন আরও সাতজন। নেপালের হিসাবে দেশটির ২ হাজার ৪২৬ জন নিখোঁজ, যাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তিব্বতের গিরং এলাকায় আরও ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদা ও ধ্বংসস্তূপ। কোথাও রাস্তা নেই, কোথাও সেতু ভেসে গেছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার অভিযানও কয়েক দফা ব্যাহত হয়েছে। তবে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে আসার পর আবারও উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত নেপালে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গেও শতাধিক মানুষ আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের উদ্ধারে বিশেষায়িত সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশ উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে তিব্বতের গিরং সীমান্তে পৌঁছে চীনা উদ্ধারকারী দল ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে হতবাক হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত স্থাপনাটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকারীরা ড্রোন ব্যবহার করে এলাকা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতর সম্ভাব্য জীবিতদের খুঁজছেন।
পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৫ বিলিয়ন ডলার
দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নেই। বিপুলসংখ্যক সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। নেপালের অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশটির পুনর্গঠনে প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
নেপাল সাধারণ উদ্ধার অভিযানের জন্য বিদেশি বাহিনী না চাইলেও জটিল উদ্ধার, প্রযুক্তি, বিশেষ সরঞ্জাম এবং মৃতদেহ শনাক্তকরণে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় সেগুলো সংরক্ষণ ও পরিচয় শনাক্ত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য এখন ধ্বংস হয়ে যাওয়া জনপদগুলোতে। স্বজনদের ছবি হাতে নিয়ে মানুষ অপেক্ষা করছেন—কেউ হয়তো ফিরে আসবেন, এই আশায়। কেউ খুঁজছেন বাবা-মা, কেউ সন্তান, কেউ ভাই কিংবা জীবনসঙ্গীকে।
হিমালয়ের এই বিপর্যয় আবারও দেখিয়ে দিল, পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন ও হিমবাহের পরিবর্তনকে উচ্চপর্বত অঞ্চলে এমন বিপর্যয়ের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করছেন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই দুর্যোগ এখন আর শুধু একটি দেশের বন্যা নয়—এটি পরিণত হয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে। উদ্ধার অভিযান চলছে, কিন্তু নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার মানুষের স্বজনদের কাছে প্রতিটি ঘণ্টাই এখন অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার।