তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ব্রিটেনে বাড়তে পারে মানুষের খরচ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ব্রিটেনে বাড়তে পারে মানুষের খরচ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৯ অক্টোবর  :

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে যুক্তরাজ্যে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের খরচ বাড়ার আশঙ্কায় আগামী বছর দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের সংসার খরচ, বাড়ির ঋণের কিস্তি, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে।

যুক্তরাজ্যের বাজেটবিষয়ক স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি (ওবিআর) জানিয়েছে, ২০২৭ সালে দেশটির অর্থনীতি মাত্র ১ শতাংশ বাড়তে পারে। গত মার্চে সংস্থাটি আগামী বছরের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। অর্থাৎ নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির হার ০ দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে।

তবে চলতি বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়িয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। আগের পূর্বাভাস ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।

জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়বে সংসার খরচ

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চল। সেখানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যুক্তরাজ্য বিদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।

জ্বালানির খরচ বাড়লে পরিবহন, পণ্য উৎপাদন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়তে পারে। এসব বাড়তি খরচের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের বহন করতে হয়। ফলে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো বেশি চাপে পড়তে পারে। কারণ, তাদের আয়ের বড় অংশ বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং গ্যাস-বিদ্যুতের বিল পরিশোধে ব্যয় হয়।

সুদের হার বাড়লে বাড়বে ঋণের কিস্তি

জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার কমানোর পরিবর্তে তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে সুদের হার বাড়ানো হবে কি না, সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

সুদের হার বাড়লে বাড়ি কেনার জন্য নেওয়া মর্টগেজ ঋণ এবং ব্যবসায়িক ঋণের খরচ বাড়তে পারে। যেসব বাড়ির মালিকের ঋণের সুদের হার পরিবর্তনশীল, তাদের মাসিক কিস্তি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদের ঋণ নতুন করে নবায়নের সময়ও বেশি সুদ গুনতে হতে পারে।

অন্যদিকে, ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

চাকরির বাজারেও বাড়তে পারে চাপ

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগ কমাতে পারে কিংবা ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটতে পারে।

এর ফলে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য নতুন কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রবৃদ্ধি কমার অর্থ এই নয় যে সব খাতে চাকরি কমে যাবে। বিভিন্ন শিল্প ও সেবাখাতে পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।

যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব পরিবার ভাড়া, পরিবহন, খাবার ও জ্বালানির খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তাদের মাসিক বাজেটে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীদেরও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

আগামী বছর ঘুরে দাঁড়াবে কি অর্থনীতি?

ওবিআরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। ২০২৯ সালে তা বেড়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ২০৩০ সালে ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০৩১ সালে ১ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছর অর্থনীতির গতি কমলেও পরবর্তী বছরগুলোতে কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম, মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের ওপর।

সরকারের জন্যও পরিস্থিতি সহজ হবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমলে রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ বাড়লে জনসেবা ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে থাকা অর্থের ওপর চাপ পড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব যুক্তরাজ্যের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আগামী দিনে সংসার চালানোর খরচ কতটা বাড়বে, বাড়ির ঋণের কিস্তি কীভাবে সামলাতে হবে এবং চাকরি ও ব্যবসার পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে।