‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের মৃত্যু, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ

ইউরোপ প্রতিনিধি, ২৯ অক্টোবর:

স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় রাজধানী মাদ্রিদে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দেশটির পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সামনে এক হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়ে দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তের পদত্যাগ দাবি করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

দুর্ঘটনাটি আগামী ২৯ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশটির রাজনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

পুলিশের সঙ্গে কেন সংঘর্ষ

বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি ছিল, ভয়াবহ দুর্ঘটনার দায় সরকারকে নিতে হবে এবং পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তেকে পদত্যাগ করতে হবে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেই সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ধাক্কা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে কয়েকজন বিক্ষোভকারী আতশবাজি ও বিভিন্ন বস্তু পুলিশের দিকে ছুড়লে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়।

স্পেনের সংবাদ সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, বিক্ষোভটি ডানপন্থী ও চরম ডানপন্থী কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল। সেখানে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার এবং পরিবহনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের একাংশ সরকারের পদত্যাগের দাবিও তোলে।

কীভাবে ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা

মধ্য স্পেনের তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকার কাছে বুধবার সকালে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। একটি ট্রেন স্থির অবস্থায় থাকা অন্য ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দিলে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে অন্তত ৬৮ জন নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

দুর্ঘটনায় জড়িত একটি ট্রেন পরিচালনা করছিল রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফে (RENFE), অন্যটি বেসরকারি রেল সংস্থা ইরিও (IRYO)। দুটি ট্রেনই মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সেভিলের দিকে যাচ্ছিল।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রেললাইনের একটি অংশে সংকেত ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কয়েকটি ট্রেন থেমে যায়। এরপর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন। কিন্তু সামনে থাকা ইরিওর ট্রেনটি তখনও থেমে ছিল। পরে রেনফের ট্রেনটি সেটির পেছনে ধাক্কা দেয়।

তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি এবং নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সিদ্ধান্তের ভূমিকা নির্ধারণে তদন্ত চলছে। তাই প্রাথমিক তথ্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রেল নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

এ বছরের জানুয়ারিতেও স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা দেশটির রেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

স্পেনের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির পরিবহন খাতের অন্যতম সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু পরপর দুটি বড় দুর্ঘটনার পর রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণ, সংকেতব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নিরাপত্তা তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষ করে মাদ্রিদ-সেভিল রেলপথের পুরোনো সংকেতব্যবস্থা আধুনিকায়নের কাজ কেন এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই অবকাঠামোগত বিষয়গুলোর সঙ্গে সর্বশেষ দুর্ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ

আগামী ২৯ নভেম্বর স্পেনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এমন সময়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিরোধী দলগুলো দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

প্রধান বিরোধী দল পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েস ফেইহো দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দল দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে নির্বাচনী প্রচারের কিছু কর্মসূচি বাতিল করে। অন্যদিকে, ডানপন্থী ভক্স দলের নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সরকার তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে। সানচেজ বলেছেন, তদন্তে অবহেলা বা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি এখন সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—নিহতদের পরিবার ও আহতদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা এবং রেলব্যবস্থার নিরাপত্তার বিষয়ে জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের আগে সরকার এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়, তা স্পেনের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।