“নারী নেতৃত্বে বিশ্বাস নেই” এবং ‘৭১-এ জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক—আল জাজিরাকে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক, ৩০ জানুয়ারি: কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রতি প্রচারিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। ‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’ শিরোনামে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। দুই দশক ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় আধিপত্যের পর জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াতে ইসলামীর নতুন করে আলোচনায় আসা—এই বাস্তবতা থেকেই সাক্ষাৎকারের সূচনা।
সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে উঠে আসে একাধিক স্পর্শকাতর প্রশ্ন—১৯৭১ সালের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালু করার পরিকল্পনা, নারীর অবস্থান, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা নিয়ে দলের দৃষ্টিভঙ্গি। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে নারীদের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, যা সামাজিক মাধ্যমে ইতোমধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নিচে জামাতের আমি শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান কীভাবে দেখছেন?
শফিকুর রহমান: গত দুই দশকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। জামায়াত সবসময়ই তৃতীয় শক্তি ছিল। কিন্তু জনগণ এখন বিকল্প খুঁজছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, আমরা আবার একটি বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসছি।
প্রশ্ন: আপনারা ক্ষমতায় এলে দেশে কি ইসলামিক আইন চালু করবেন?
শফিকুর রহমান: আমরা বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। জনগণের ইচ্ছার বাইরে কিছু করবো না। যদি দেশের মঙ্গলের জন্য প্রয়োজন হয়, সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্ত নয়।
প্রশ্ন: নারীদের নিয়ে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। এবার তো আপনাদের দলে একজন নারী প্রার্থীও নেই।
শফিকুর রহমান: আমরা এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে চাই। তবে জামায়াতের আমির পদে নারী আসা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: কেন সম্ভব নয়?
শফিকুর রহমান: আল্লাহ মানুষকে একেকভাবে সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারে না, বুকের দুধ খাওয়াতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে, যা অস্বীকার করা যায় না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তখন তিনি পূর্ণভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না—এটাই বাস্তবতা।
প্রশ্ন: আপনি কি নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে শুধু শিশু লালন-পালনের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন?
শফিকুর রহমান: না, আমি এমন কোনো প্রস্তাব কখনো করিনি।
প্রশ্ন: জামায়াতের উত্থান কি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি?
শফিকুর রহমান: আমরা এ ধরনের কোনো বক্তব্য সমর্থন করি না। কিছু ব্যক্তি ভুল করলে আমরা তার নিন্দা করেছি। ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয় এবং আইনি কাঠামোর অংশও নয়। ভুল হলে সংশোধন করতে হবে, পুনরাবৃত্তি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশ্ন: সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াত জড়িত—এমন অভিযোগ রয়েছে।
শফিকুর রহমান: জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে বহু অভিযোগ আনা হয়েছে, কিন্তু আদালতে একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টও আমি প্রত্যাখ্যান করছি।
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
শফিকুর রহমান: তখনকার জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক, কোনো সশস্ত্র সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন, ভারতের সহায়তায় বিচ্ছিন্ন হলে বাংলাদেশ ভারতের আধিপত্যে পড়তে পারে।
প্রশ্ন: কিন্তু বুদ্ধিজীবী হত্যায় জামায়াত–সংশ্লিষ্ট বাহিনীর জড়িত থাকার প্রমাণের কথা বলা হয়।
শফিকুর রহমান: ওই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান যে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, তারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা।
প্রশ্ন: ভারত যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেয়, তখন আপনারা কী করবেন?
শফিকুর রহমান: ভারতের সঙ্গে ফলপ্রসূ সংলাপ করব। আমরা প্রতিবেশীদের কোনো অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পর্ক চাই।
প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্ম কি জামায়াতকে গ্রহণ করবে বলে মনে করেন?
শফিকুর রহমান: সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা আমাদের ছাত্রসংগঠনের পক্ষে রায় দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, তরুণদের মর্যাদা ও অধিকার আমরা রক্ষা করতে পারব।
শেষ কথা: আল জাজিরাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমির স্পষ্ট করেছেন—দলটি নিজেকে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে দেখছে, তবে নারী নেতৃত্ব, ইসলামিক আইন ও ১৯৭১–এর প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, ডা. শফিকুর রহমান ১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে ছাত্রজীবনে তিনি জাসদ ছাত্রলীগ ও ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে সক্রিয় ছিলেন এবং সিলেট মেডিকেল কলেজ শাখা ও শহর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। সিলেট শহর, জেলা ও মহানগরী আমীরের দায়িত্বের পর ২০১৬ সালে সেক্রেটারি জেনারেল হন। ২০১৯ সালে রুকনগণের ভোটে প্রথমবার এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হয়ে অদ্যবধি দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি সিলেট মহানগরীর শাহপরান থানার সবুজবাগে বসবাস করেন।