ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাসী আধিপত্য ও অবৈধ অস্ত্রে বাংলাদেশে খুন হচ্ছে গড়ে ১০ জন!
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৩০ জুলাই:
রাজনৈতিক প্রতিশোধ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য গুলি, টার্গেট কিলিং এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের বছরের একই সময়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৯৯৩টি, তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা ছিল পুরোনো ঘটনার ধারাবাহিকতা। ২০২৪ সালের একই সময়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৭৯৪টি। ফলে চলতি বছরের নতুন ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ঢাকার পরেই চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি খুন
জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। গত তিন মাসে এই অঞ্চলে ২০৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ, যেখানে ১৮৬টি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। রাজশাহীতে ১০৬টি এবং খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে।
মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে রাজধানী ঢাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ঢাকায় ৫৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে রাজধানীর পর চট্টগ্রামেও অপরাধ পরিস্থিতি দ্রুত উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
রাউজান: আতঙ্কের নতুন নাম
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গত ১৩ জুন একটি ব্যস্ত বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি এসে খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়।
এর আগে গত ৫ জানুয়ারি একই উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে নিজ বাড়ির সামনে মুখোশধারীদের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা জানে আলম সিকদার।
স্থানীয়দের ভাষায়, রাউজান এখন ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শুধু রাউজানেই অন্তত ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে।
একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধসহ ৩৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
লুট হওয়া অস্ত্র এখনো বড় উদ্বেগ
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৯৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায় ৭০০টি অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও এখনো প্রায় ১৬৫টি অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে থাকলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সহিংসতার কারণ হতে পারে।
কারাগার থেকে ফিরে সক্রিয় পুরোনো অপরাধীরা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে পুরোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পুনরুত্থানও একটি বড় কারণ।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকজন আলোচিত গ্যাং লিডার ও সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়ে বা বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, এসব অপরাধী তাদের পুরোনো নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এরই অংশ হিসেবে শুরু হয়েছে এলাকায় এলাকায় প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার লড়াই।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ১ মে থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অভিযানে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৭৮৫ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ৫২টি ম্যাগজিন, ৩২টি হাতবোমা এবং প্রায় ২ হাজার ২০০ কেজি গানপাউডার।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অস্ত্র উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অস্ত্রের উৎস, চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।
সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে বিদেশি অস্ত্র
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে।
গত দেড় বছরে যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যার অনেকগুলোতেই বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। এছাড়া পাওয়া গেছে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেলও।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর যশোর সীমান্ত দিয়েই দেশে সবচেয়ে বেশি ছোট অস্ত্র প্রবেশ করছে। সহজে বহনযোগ্য এসব অস্ত্র অপরাধীদের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত হন। মার্চে ১১৩টি ঘটনায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৯১২ জন আহত হয়েছেন।
এই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
মোহাম্মদপুরেও সক্রিয় সন্ত্রাসী চক্র
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিয়মিত অভিযানের মধ্যেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থামছে না।
সম্প্রতি র্যাব অভিযান চালিয়ে বিদেশি অস্ত্রসহ সোহেল ওরফে ‘মাওরা সোহেল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন
রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরাধী চক্রের পুনর্গঠন এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হলে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান নয়, অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ, অস্ত্র চোরাচালানের পথ বন্ধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ প্রতিটি প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করছে না, বরং সাধারণ মানুষের মনে তৈরি করছে ভয়—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন।