জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১৩, আতঙ্কে রাত কাটালেন হাজারো মানুষ
বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ৩০ জুলাই:
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর চলছে জীবন বাঁচানোর লড়াই। ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ কম্পনে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা নিখোঁজদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেলে কুমামোতো প্রিফেকচারে আঘাত হানা ভূমিকম্পটি জাপানের শিনদো স্কেলে সর্বোচ্চ ৭ মাত্রার কম্পন সৃষ্টি করে। কম্পনের পর প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি বলেন, “যারা এখনো উদ্ধার অপেক্ষায় আছেন, তাদের খুঁজে বের করা আমাদের জন্য সময়ের বিরুদ্ধে এক লড়াই।”
সরকারি হিসাবে, বুধবার সকাল পর্যন্ত পাঁচটি প্রিফেকচারের ৫০৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৯ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। প্রায় ৩ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ধসে পড়েছে ভবন, আগুন ও বিস্ফোরণ
ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কুমামোতো ও আশপাশের এলাকায়। ইয়াতসুশিরোর একটি কাগজ কারখানায় বিশাল চিমনি ধসে পড়ে। সেখানে দুই শ্রমিককে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং আরও কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
কুমামোতো প্রিফেকচারের একটি বড় শপিং মল ‘এইওন মলে’ বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে সেখানে গ্যাস লিকের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই ঘটনায় দুই তরুণীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
হাসপাতালগুলোতেও চাপ বেড়েছে। অনেক আহত মানুষকে পোড়া ও হাড় ভাঙার সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে কয়েকটি হাসপাতালের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
বিদ্যুৎ-পানিহীন হাজারো পরিবার
ভূমিকম্পের পর প্রায় ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। পানির সংকটে পড়েন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। বুধবার ওই অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়ানোর পূর্বাভাস থাকায় উদ্ধারকেন্দ্রে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়েছে।
অনেক বাসিন্দা আফটারশকের ভয়ে ঘরে ফিরতে সাহস করেননি। অনেকে গাড়ির ভেতর রাত কাটিয়েছেন।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর এক সপ্তাহ পর্যন্ত বড় ধরনের পরবর্তী কম্পন ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে ৬০টির বেশি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।
সেনাবাহিনী মোতায়েন, বন্ধ রেল ও বিমান চলাচল
দুর্যোগ মোকাবিলায় জাপানের সামরিক বাহিনীর ৩ হাজার ৬০০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণে ২০টি বিমান পাঠানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের কারণে কিউশু অঞ্চলের দ্রুতগতির ট্রেনসহ বেশ কয়েকটি রেল পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। কুমামোতো বিমানবন্দরের রানওয়েও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়।
মোবাইল নেটওয়ার্কেও সমস্যা দেখা দেয়। বিদ্যুৎ ঘাটতি ও যোগাযোগ লাইনের ক্ষতির কারণে কয়েকটি টেলিকম সেবা ব্যাহত হয়েছে।
কঠোর নির্মাণনীতি রক্ষা করেছে বহু প্রাণ
ভূমিকম্পের তীব্রতা অনেক বেশি হলেও জাপানের কঠোর নির্মাণনীতি বড় ধরনের প্রাণহানি কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আধুনিক ভবনগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে অনেক স্থাপনা ভয়াবহ কম্পনেও টিকে গেছে।
জাপান বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থানের কারণে দেশটিতে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। বিশ্বের ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের প্রায় ২০ শতাংশই ঘটে জাপান অঞ্চলে।
কুমামোতো অঞ্চল এর আগেও বড় ভূমিকম্পের শিকার হয়েছিল। ২০১৬ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সেখানে ২৭৫ জন নিহত এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছিলেন। ২০১১ সালের ৯ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির স্মৃতিও এখনো জাপানবাসীর মনে তাজা, যেখানে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন।