চিনির মিষ্টিতে লুকিয়ে বিষ! বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ নমুনায় মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

চিনির মিষ্টিতে লুকিয়ে বিষ! বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ নমুনায় মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ৩০ জুলাই:  চায়ের কাপে যে চিনি প্রতিদিন মিশছে, সেই চিনিতেই থাকতে পারে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা! বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া চিনির ওপর নতুন এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ৯৫ শতাংশেই পাওয়া গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি চিনিতে ২১০ থেকে ৫০৮টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে মানুষ অজান্তেই এসব ক্ষুদ্র কণা গ্রহণ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। গবেষণার অংশ হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনি পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা কিছুটা বেশি হলেও দুই ধরনের চিনির মধ্যে বড় ধরনের পরিসংখ্যানগত পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

চিনির ভেতরে কী ধরনের প্লাস্টিক?

পরীক্ষায় পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলোর আকার ছিল ১২ মাইক্রোমিটারের কম থেকে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ১৯ মিলিমিটার পর্যন্ত।

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কণার মধ্যে—

  • প্রায় ৬৩ শতাংশ ছিল তন্তু বা ফাইবার
  • ২১ শতাংশ ছিল প্লাস্টিকের খণ্ড
  • ১১ শতাংশ ছিল পাতলা স্তর বা ফিল্ম
  • প্রায় ৫ শতাংশ ছিল গোলাকার কণা

উন্নত প্রযুক্তির এফটিআইআর (FTIR) বিশ্লেষণে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—PVC, PET, HDPE, নাইলন, পলিকার্বোনেটসহ আরও কয়েক ধরনের পলিমার।

উৎপাদন থেকে প্যাকেট—কোথায় দূষণ?

গবেষকদের মতে, চিনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। চিনি উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং, পরিবহন এবং সংরক্ষণের সময় ব্যবহৃত প্লাস্টিক উপকরণ থেকে এসব কণা খাদ্যে মিশে যেতে পারে।

এ ছাড়া পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্যও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অন্যতম উৎস হতে পারে।

মানবদেহে ঢুকছে অদৃশ্য কণা

গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু চিনি গ্রহণের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন প্রতি কেজি শরীরের ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.২১৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন।

তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমান গবেষণায় এসব কণার কারণে নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে কিছু প্লাস্টিক পলিমারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

চিনি, তেল, টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

বাংলাদেশে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে এর আগেও কয়েকটি গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সয়াবিন তেলের ওপর এক গবেষণায় বোতলজাত ও খোলা তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়।

এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর গবেষণায় দেশের বাজারে থাকা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। এমনকি শিশুদের ব্যবহারের কয়েকটি টুথপেস্টেও এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।

খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ

গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারা খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক পরীক্ষা চালু করা, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন।

প্রশ্ন উঠছে—যে চিনি মানুষের জীবনে মিষ্টতা আনে, সেই চিনির সঙ্গে অদৃশ্য প্লাস্টিক কণা কতটা নীরবে আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক এবং খাদ্য উৎপাদকদের।