বাংলাদেশ সংবাদ

নেই বিদ্যুৎ, নেই গ্যাস : ভোগান্তিতে প্রিয় দেশ

নেই বিদ্যুৎ, নেই গ্যাস : ভোগান্তিতে প্রিয় দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ৩০ আগস্ট:

বিদ্যুৎ নেই। গ্যাস নেই। তীব্র গরমের মধ্যে দুই সংকট একসঙ্গে নেমে এসেছে মানুষের জীবনে। রাজধানী থেকে শিল্পাঞ্চল—দেশের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং ও গ্যাসের স্বল্প চাপে নাকাল সাধারণ মানুষ।

শনিবার বিকেলে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি একপর্যায়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৬৯ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯৫২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫১৭ মেগাওয়াট।

সন্ধ্যা ৭টায় চাহিদা বেড়ে ১৭ হাজার ৫৪১ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৫৩১ মেগাওয়াট। ঘাটতি তখনও ৩ হাজার ১০ মেগাওয়াট।

গ্যাসের সংকটেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধাক্কা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাস। কিন্তু এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না।

শনিবার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কয়েক ঘণ্টা সামিটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ আরও কমে যায়। পেট্রোবাংলার হিসাবে, রাত ৮টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২১৯ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ঘনফুট।

কয়েক দিন আগেও এলএনজি থেকে ৭৫ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে।

কয়লা-তেলেও সংকট

গ্যাসের পাশাপাশি কয়লার ঘাটতিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। কয়লা সংকটে আদানি কেন্দ্র থেকেও কয়েক শ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। পায়রা কেন্দ্রেও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

ঘাটতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের অভাবে সেখানেও প্রত্যাশিত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

ফলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় একই সময়ে গ্যাস, কয়লা ও তেলের সংকট তৈরি হয়েছে।

ঘরে রান্না, বাইরে কারখানা—সবখানেই সংকট

গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা বা ইন্ডাকশনের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু রান্নার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই বিকল্পও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও বাধ্য হয়ে এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে, বাড়ছে সংসারের খরচ।

শিল্পাঞ্চলেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে লোডশেডিং যোগ হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান জেনারেটর চালাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে রপ্তানি পণ্য সময়মতো সরবরাহের অনিশ্চয়তা।

গ্যাসের স্বল্পতায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দেখা দিয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অনেক চালককে।

প্রিয় দেশের মানুষের প্রশ্ন

বিদ্যুৎ ও গ্যাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। অথচ একই সময়ে দুটির সংকট তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে ঘাটতিও বাড়তে পারে।

মানুষের প্রশ্ন তাই খুব সহজ—যে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ছাড়া একটি দিনও স্বাভাবিকভাবে চলে না, সেখানে এই দুই জরুরি সেবার স্থায়ী নিশ্চয়তা কবে মিলবে?

প্রিয় দেশের মানুষ আলো চায়, চায় রান্নার জন্য গ্যাস—চায় স্বাভাবিক জীবন। আর সেই স্বাভাবিক জীবন যেন এখন দিন দিন আরও দুর্লভ হয়ে উঠছে।