নজরুলে প্রয়ান দিবস উপলক্ষে বিশেষ কলাম
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৫৬ ।। নজরুলের কবর: চুরুলিয়ার মাটি থেকে ঢাকার আকাশ
উৎসর্গ
চুরুলিয়ার যে মাটিতে তাঁর জন্ম,
ঢাকার যে মাটিতে তাঁর শেষ নিদ্রা—
সেই দুই বাংলার হৃদয়জুড়ে বেঁচে থাকা
বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার অমর কবি
কাজী নজরুল ইসলামকে।

আজ ২৯ আগস্ট। কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস।
প্রতিবছর এই দিনটি ফিরে আসে। আমরা নজরুলকে স্মরণ করি। তাঁর কবিতা আবৃত্তি করি, গান গাই, আলোচনা সভা করি। কেউ তাঁকে বিদ্রোহের কবি বলি, কেউ সাম্যের কবি, কেউ মানবতার কবি। বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে। ভারত তাঁকে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে স্মরণ করে।
কিন্তু নজরুলের প্রয়াণ দিবসে আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—নজরুলের শেষ ঠিকানা কি ঢাকাতেই হওয়ার কথা ছিল? নাকি চুরুলিয়ার মাটিতে, তাঁর জন্মভিটার পাশে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিও জড়িয়ে আছে।
নজরুলের ওপর পিএইচডি গবেষণার প্রস্তুতির সময় ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত আমি বেশ কয়েকবার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়ায় গিয়েছি। শুধু একবার গিয়ে দর্শনার্থীর মতো ফিরে আসিনি। থেকেছি। মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলো ঘুরে দেখেছি। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি।
চুরুলিয়া আমার কাছে তখন শুধু একটি গ্রাম ছিল না। মনে হতো, সেখানে হাঁটলে নজরুলের শৈশবের শব্দগুলো যেন বাতাসে মিশে আছে।
আমি চুরুলিয়ার যুব আবাসনে থেকেছি। খেয়েছি কবির ভাতিজা কাজী রেজাউল করিম সাহেবের বাড়িতে। সেই প্রথম থালায় করে সব তরকারী ও ভাত একসাথে খেয়েছিলাম। এভাবে খেয়ে অভ্যাস না থাকায় বেশ অসুবিধায় পড়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছি। তাঁর ছেলে গায়ক সুবর্ণ কাজীর সঙ্গেও কথা হয়েছে। সে চমৎকার কন্ঠে নজরুলের কয়েকটি গান শুনিয়েছিল। এর মধ্যে একটা ছিল নজরুলের হিন্দি গান..‘নারগিস বাগমে..বাহার সে দাগমে..’’। অসাধারণ লেগেছিল সেই গানটি। পর পর দু‘বার গেয়ে শুনিয়েছিল সুবর্ণ। তখন তাঁকে দেখতে লাগতো তরুণ নজরুলের মতো। লন্ডনে এসেছিল। কোলকাতার নন্দনে আমাকে বেশ ঘুরে অনুষ্ঠান দেখিয়েছিল একবার। আমার বেশ ভাল বন্ধু সুবর্ণ। তাঁকে বেশ মিস করি। খুব দিলখোলা মানুষ। নজরুলের পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর বাড়িতে গিয়েছি কোলকাতায়। সেখানে বসে কথা শুনেছি, যেখানে কবির জীবনের স্মৃতি তখনও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছিল।
নজরুল গবেষক ড. কল্পতরু সেনগুপ্তের সঙ্গেও কথা বলেছি। তখনই তাঁর বয়স ছিল ৮৪ বছর। সল্টলেকের ১৩ নম্বর রোডে ছিল বাড়ি। গবেষণার কাজে তাঁর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছি। অনেক স্নেহ করতেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী। চুরুলিয়ার মানুষ, নজরুল পরিবারের সদস্য এবং গবেষকদের সহযোগিতাই শেষ পর্যন্ত আমাকে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলকে নিয়ে গবেষণার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।
সেই সময়ের কথোপকথন আজও আমার মনে আছে।
বিশেষ করে নজরুলের শেষকৃত্য নিয়ে তাঁদের আক্ষেপ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
কবি নজরুলের ভাতিজা কাজী রেজাউল করিম সাহেব এবং কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী আমাকে বলেছিলেন, কবির স্ত্রী প্রমীলা নজরুলের ইচ্ছা ছিল—মৃত্যুর পর যেন স্বামীর সঙ্গে পাশাপাশি তাঁর কবর হয়।
প্রমীলা নজরুলের সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। তাঁকে চুরুলিয়াতেই কবর দেওয়া হয়। আর নজরুলের মৃত্যুর পর ঢাকায় তাঁর কবর থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে এসে চুরুলিয়ায় প্রমীলার কবরের পাশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমি নিজের চোখে চুরুলিয়ায় প্রমীলা নজরুলের কবর দেখেছি। দেখেছি কবির পুত্র কৃষ্ণ মোহাম্মদ, যিনি বুলবুল নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন, তাঁর কবরও। ওটা ওদের পারিবারিক গোরস্তান।
সেই কবরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল—একজন কবির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর স্মৃতি কত বিচিত্রভাবে ছড়িয়ে থাকে। কেউ আছেন চুরুলিয়ার মাটির নিচে, কেউ ঢাকার মাটিতে, অথচ তাঁদের জীবন একই পরিবারের, একই ভালোবাসার গল্প।

নজরুল যে ঘরে জন্মেছিলেন সেটি ১৯৫৬ সালে একটা তাঁর ওপর একটা ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর ভেঙে ফেলা হয়। ওখানে আজ নজরুল একাডেমি। তবে নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত সেই পীর পুকুর ও মসজিদ এখনও আছে। এসব তথ্য জানালেন রেজাউল করিম সাহেব। আর চুরুলিয়াতে প্রতি বছর এখন যে ‘নজরুল মেলা’ হয় সেটি প্রথম শুরু করেছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় ড. কল্পতরু সেন গুপ্ত মহাশয়। তাঁর বাড়িতেও অনেক খেয়েছি। সবার প্রতি আজ কৃতজ্ঞতা আবার প্রকাশ করছি, যদিও আজ কল্যাণী কাজী, ড সেন প্রমুখ বেঁচে নেই।
আজ বিবিসি বাংলার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই ইতিহাস নতুন করে সামনে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট নজরুলের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের একটি অংশ চেয়েছিল কবিকে চুরুলিয়ায় এনে স্ত্রী প্রমীলা দেবীর কবরের পাশে সমাহিত করা হোক। এমনকি কবির ভ্রাতুষ্পুত্র কাজী রেজাউল করিম ও কাজী মজহারুল হোসেন কবরও প্রস্তুত করে রেখেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্য আমার কাছে নতুন ছিল না।
চুরুলিয়ায় যাঁদের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম, তাঁদের কথার মধ্যেও একই আকাঙ্ক্ষা ও বেদনা অনুভব করেছিলাম।
তাঁদের কাছে নজরুল ছিলেন শুধু বাংলাদেশের জাতীয় কবি নন। তিনি ছিলেন চুরুলিয়ার সন্তান। যে মাটিতে তাঁর জন্ম, যে মাটিতে তাঁর শৈশব কেটেছে, যে মাটির মানুষের সঙ্গে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক—সেই মাটিতেই তাঁর শেষ শয্যা হবে, এটাই ছিল তাঁদের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু ইতিহাস অন্য পথ বেছে নেয়।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহযোগিতায় নজরুলকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তখন কেউ হয়তো ভাবেননি, কলকাতা থেকে ঢাকায় আসা এই যাত্রাই একদিন তাঁর শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াবে।
নজরুল তখন আর স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর অবস্থায় ছিলেন না। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা তাঁকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল। তিনি ঢাকায় কাটালেন জীবনের শেষ কয়েকটি বছর।
তারপর এল ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট।
নজরুল চলে গেলেন।
আর সেই সঙ্গে তৈরি হলো দুই বাংলার ইতিহাসে এক অদ্ভুত বেদনার অধ্যায়।
কবির বড় ছেলে কাজী সব্যসাচী তখন কলকাতায়। খবর পাওয়ার পর তিনি ঢাকায় আসার জন্য ছুটলেন। সঙ্গে ছিলেন পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী। কিন্তু তাঁদের বিমান দেরিতে পৌঁছায়। তাঁরা ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই কবির দাফন সম্পন্ন হয়ে যায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কবির পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে পরবর্তীকালে নানা ব্যাখ্যাও ছিল। কেউ মনে করেছেন ধর্মীয় রীতি ও সময়ের কারণে দ্রুত দাফন করা হয়েছিল। আবার পরিবারের কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের আগে পৌঁছাতে না দেওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।
ইতিহাসের এই জায়গাটিই সবচেয়ে স্পর্শকাতর।
কারণ, এখানে শুধু একজন কবির দাফনের প্রশ্ন নেই। এখানে আছে রাষ্ট্র, পরিবার, দুই দেশের সম্পর্ক, জাতীয় পরিচয় এবং একজন কবির প্রতি মানুষের আবেগ।
ঢাকায় নজরুলকে সমাহিত করার সিদ্ধান্তেরও একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল। তিনি তখন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছেন। ঢাকায় তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছর কেটেছে। তাঁর নিজের কবিতা ও গানে মসজিদের পাশে কবর দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও পাওয়া যায়—“মসজিদেরও পাশে আমায় কবর দিও ভাই।”
শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
আজ সেই কবর বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক পবিত্র স্মৃতিস্থান।
কিন্তু তাই বলে চুরুলিয়ার মানুষের কষ্ট কি মুছে গেছে?
না।
আমি যখন চুরুলিয়ায় গিয়েছি, তখন বহু বছর পেরিয়ে গেছে নজরুলের মৃত্যুর পর। তবু মানুষের কথায় সেই আক্ষেপের রেশ ছিল।
আর চুরুলিয়ায় শুধু কবর নয়, নজরুলের শৈশব ও জীবনের কত স্মৃতি যে ছড়িয়ে আছে, তা কাছ থেকে না দেখলে বোঝা কঠিন।
কবির যে ঘরটিতে তাঁর জন্ম হয়েছিল, সেটিও আমি দেখেছি। এখন সেই জন্মঘরটি আর আগের অবস্থায় নেই; সেটিকে একটি লাইব্রেরিতে রূপান্তর করা হয়েছে। ১৯৫৬ সালে কবিকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র নির্মাণের পর তাঁর জন্মবাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল বলে সেখানে জানতে পেরেছি।
তবে সবকিছু হারিয়ে যায়নি।
নজরুল ছোটবেলায় যে মসজিদে ইমামতি করতেন, সেটি এখনো আছে। যে পীরের মাজারে তিনি খাদেমগিরি করতেন, সেই মাজারও আগের মতোই আছে।
সেই জায়গাগুলোতে দাঁড়ালে মনে হয়, ইতিহাস কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়।
নজরুলের জীবন অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি চুরুলিয়া ছাড়িয়ে বর্ধমান শহরেও গিয়েছি। সেখানে যে রুটির দোকানে কবি একসময় কাজ করতেন, সেটিও আমি ভিজিট করেছিলাম।
সেই দোকানের মালিকের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতাটিও আমার মনে আছে।
তিনি আমার সঙ্গে বেশ ভয়ভয়ে কথা বলছিলেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল, আমি অথবা আমার সঙ্গে থাকা লোকজন হয়তো তাঁর দোকানটি সরকারীকরণ করে নিয়ে যাব!
আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, আমরা সরকারের লোক নই। আমরা এসেছি কবির স্মৃতি খুঁজতে, তাঁর জীবন সম্পর্কে জানতে।
আজ এত বছর পর সেই ঘটনার কথা মনে হলে হাসিও পায়, আবার ভালোও লাগে।
কারণ, একজন কবি কীভাবে একটি সাধারণ রুটির দোকানকেও ইতিহাসের অংশ করে যেতে পারেন—সেটি তখন আরও স্পষ্টভাবে বুঝেছিলাম।
এভাবে নজরুলকে ঘিরে আমার আরও অনেক স্মৃতি আছে।
সেগুলো একদিন একদিন করে লেখা যাবে।
আজ শুধু এটুকু বলি—নজরুলকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি বইয়ের পাতার নজরুলকে একসময় মানুষের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলাম।
রেজাউল করিম সাহেবের স্মৃতিতে।
সুবর্ণ কাজীর কণ্ঠে।
কল্যাণী কাজীর কথায়।
ড. কল্পতরু সেনগুপ্তের গবেষণায়।
চুরুলিয়ার মানুষের ভালোবাসায়।
প্রমীলা নজরুলের কবরের পাশে।
বুলবুলের কবরের নীরবতায়।
নজরুলের জন্মঘরের স্মৃতিতে।
সেই মসজিদে, যেখানে ছোট্ট নজরুল ইমামতি করতেন।
সেই মাজারে, যেখানে তিনি খাদেমের দায়িত্ব পালন করতেন।
এবং বর্ধমানের সেই রুটির দোকানে, যেখানে কবির জীবনের এক অজানা অধ্যায় কেটেছিল।
আমি বুঝেছিলাম, একজন কবির মৃত্যু কখনো শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়। কখনো কখনো তা একটি ভূখণ্ডের মানুষেরও শোক হয়ে ওঠে।
চুরুলিয়ার মানুষের কাছে নজরুল তাঁদের ঘরের ছেলে।
ঢাকার মানুষের কাছে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকার কথা ছিল না।
বরং নজরুলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তো এখানেই—তিনি বিভাজনের কবি নন, তিনি মিলনের কবি। তিনি ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করতে চাননি। জাতপাতের দেয়াল ভাঙতে চেয়েছেন। তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলনের গান গেয়েছেন। তিনি মানুষের পরিচয়কে ধর্মের পরিচয়ের ওপরে তুলে ধরেছেন।
অথচ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবর নিয়েই দুই বাংলার মানুষের মনে যদি আক্ষেপ তৈরি হয়, সেটি নজরুলের দর্শনের সঙ্গে বেমানান এক ইতিহাস।
আমি কখনো মনে করি না যে নজরুলের কবর ঢাকায় থাকা মানে চুরুলিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে।
কবর একটি জায়গায় হতে পারে। কিন্তু কবি কোনো একটি জায়গার নন।
নজরুলের জন্ম চুরুলিয়ায়। তাঁর সৃষ্টির বড় অংশের শিকড় অবিভক্ত বাংলায়। তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় ঢাকায়। তাঁর গান আজ দুই বাংলার মানুষের কণ্ঠে। তাঁর কবিতা ভারত-বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষের সম্পদ হয়েছে।
তাই নজরুলকে নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত—তাঁকে কোনো ভূখণ্ডের একক সম্পত্তি না বানানো।
বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মান করবে—এটাই স্বাভাবিক।
ভারত তাঁর জন্মভিটা সংরক্ষণ করবে—এটিও স্বাভাবিক।
চুরুলিয়ায় তাঁর স্মৃতিকে আরও যত্নে ধারণ করা হবে, ঢাকায় তাঁর সমাধি যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষিত থাকবে—এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
বরং দুই বাংলার সম্পর্কের ক্ষেত্রে নজরুল হতে পারেন সবচেয়ে বড় সেতু।
আজ, তাঁর প্রয়াণের অর্ধশতাব্দীর প্রাক্কালে, সেই পুরোনো প্রশ্নটিকে নতুন করে তোলার উদ্দেশ্য কাউকে অভিযুক্ত করা নয়। ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে নতুন করে বোঝা।
আমি যখন ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে বেশ কয়েকবার কোলকাতায় গিয়েছি, তখন আমার হাতে ছিল গবেষণার নোটবুক। আজ এত বছর পর সেই সময়ের স্মৃতিগুলো মনে করলে মনে হয়, আসলে আমি শুধু গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করিনি। আমি একজন কবির সঙ্গে একটি ভূখণ্ডের মানুষের সম্পর্কের ইতিহাসও দেখেছিলাম।
রেজাউল করিমের মুখে, সুবর্ণ কাজীর কথায়, কল্যাণী কাজীর স্মৃতিতে, গবেষক কল্পতরু সেনগুপ্তের আলোচনায়—বারবার ফিরে এসেছে সেই মানুষটি, যিনি কোনো সীমান্তের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেননি।
নজরুলের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাই তাঁর কবরের ঠিকানা নয়।
তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি মানুষের কবি।
চুরুলিয়ার মাটি তাঁকে জন্ম দিয়েছে।
ঢাকার মাটি তাঁকে শেষ আশ্রয় দিয়েছে।
আর দুই বাংলার মানুষ তাঁকে হৃদয়ে জায়গা দিয়েছে।
তবু ইতিহাসের সেই অসমাপ্ত আক্ষেপটুকু থেকে যায়।
হয়তো নজরুল আজ বেঁচে থাকলে বলতেন—আমার জন্য তোমরা মাটি নিয়ে ঝগড়া করো না। যে মাটিতে মানুষ আছে, যে মাটিতে ভালোবাসা আছে, সেই মাটিই আমার।
প্রয়াণ দিবসে বিদ্রোহী কবিকে এভাবেই মনে রাখতে চাই—
কবরের সীমানা পেরিয়ে, মানুষের হৃদয়ের ভেতরে।
কারণ নজরুলকে কবর দেওয়া যায়।
নজরুলকে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৯ আগস্ট, ২০২৬