ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় ৬ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে, দারিদ্র্যের ফাঁদে আরও ১২ লাখ : বিশ্ব ব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কায় ৬ লাখ চাকরি ঝুঁকিতে, দারিদ্র্যের ফাঁদে আরও ১২ লাখ : বিশ্ব ব্যাংক

বিশ্ব সংবাদ ডেস্ক, ৩০ আগস্ট:

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব এবার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের প্রায় ৬ লাখ মানুষের চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।

শুধু কর্মসংস্থান নয়, দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতিও বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে চলতি বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেতেন। যুদ্ধের প্রভাবে সেই সংখ্যা নেমে আসতে পারে প্রায় ৫ লাখে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এই মূল্যায়ন এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই নানা চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিয়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না এবং ব্যাংক খাতেও রয়েছে দুর্বলতা। ফলে নতুন করে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানিতে ওই অঞ্চলের ওপর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। ফলে যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনে।

এরই মধ্যে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। জ্বালানির এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। আর উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে কৃষি খাতও। সার উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন হওয়ায় জ্বালানি সংকট সরাসরি সারের সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে সেচ, পরিবহন ও অন্যান্য উপকরণের বাড়তি ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়বে খাদ্যপণ্যের বাজারে।

অন্যদিকে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের স্বল্পতা ইতিমধ্যে উৎপাদন ব্যাহত করছে। কোথাও উৎপাদন সময় কমছে, কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের আয় কমার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে শিল্প ও কর্মসংস্থানে দেখা যাচ্ছে। নতুন গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, উৎপাদন সময় কমে যাওয়া এবং কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে তিনি পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন।

মূল্যস্ফীতির চাপও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের খরচ বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপানো হয়। ফলে আয় না বাড়লেও মানুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যায়।

এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের ৬ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি লাখ লাখ পরিবারের আয়-নিরাপত্তা নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দুটি—একদিকে যুদ্ধের কারণে তৈরি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সামলানো, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে কর্মসংস্থান ধরে রাখা।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সাধারণ মানুষের ঘরে কতটা পৌঁছাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার সক্ষমতার ওপর।

বিশ্বব্যাংকের সতর্কতা তাই এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখার সময়। কারণ যুদ্ধের ধাক্কা যদি দীর্ঘ হয়, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হতে পারে বাংলাদেশের শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষকেই।