বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম দিবস ২০২৬ বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, মিথ্যা মামলা অব্যাহত; প্রেস ফ্রিডম সূচকে আবারও অবনতি
বাংলাদেশ প্রতিনিধি,৩মে:
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানি, নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সাংবাদিক নেতাদের কাছ থেকে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও দেশের গণমাধ্যম স্বাধীনতার অবস্থার অবনতি ধরা পড়েছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF) প্রকাশিত প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে এখন ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫২তম অবস্থানে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৪৯তম। সূচকটি মূলত সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা, হয়রানি এবং কাজের পরিবেশের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য—“শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠন: মানবাধিকার, উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিশ্চিত করা”।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে অন্তত ১০৬টি সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে—
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ৩৬টি হয়রানি ও হুমকি
- ২০টি হামলা, মারধর বা ভয়ভীতি
- ১৭টি দায়িত্ব পালনকালে আক্রমণ
- সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৭টি মামলা
- রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীদের হামলার একাধিক ঘটনা
ASK জানিয়েছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও দাবি
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের নেতা খুরশীদ আলম বলেছেন, “কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে আমরা রাজপথে নামবো। সরকার যেই থাকুক, আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চাই।”
অন্যদিকে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সূচকের অবনতি অতীত বছরের পরিস্থিতির প্রতিফলন।
সরকারের এক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মন্তব্য করেন, “ভুয়া সংবাদ ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।”
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
নিউইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা মামলা প্রত্যাহার ও তাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য।
সংগঠনটির দাবি, এসব মামলায় এখনো কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা চার্জশিট দাখিল করা হয়নি।
কারাবন্দি সাংবাদিক ও পরিবারের অভিযোগ
কারাবন্দি সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলায় আটক রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের পরিবার ও আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে চার্জশিট ছাড়াই আটক রাখা হচ্ছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
একজন সাংবাদিকের পরিবারের সদস্য বলেন, “২০ মাস ধরে কোনো চার্জশিট ছাড়া কারাগারে রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
আইন ও স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক
সাংবাদিক সংগঠন ও আইনজীবীরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন হলেও এর মাধ্যমে এখনও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রবণতা রয়ে গেছে।
একজন আইনজীবীর মতে, “আইনের নাম বদলালেও প্রয়োগের ধারা খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।”
সার্বিক চিত্র
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দেশীয় সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত মিলছে।
বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম দিবসের এই দিনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা কি সত্যিই স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছে, নাকি আরও সংকুচিত হচ্ছে সেই পরিসর?