‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৯ ।। রিমঝিম বৃষ্টি ও এক টুকরো জোছনা

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৩৯ ।। রিমঝিম বৃষ্টি ও এক টুকরো জোছনা

।। রিমঝিম বৃষ্টি ও এক টুকরো জোছনা।।

উৎসর্গ

তাদের জন্য—
যারা একদিন নিজের গল্পটা
নিজের মতো করে লিখবে।

বৃষ্টির সঙ্গে রিমঝিম বৃষ্টির একটা অদ্ভুত সম্পর্ক।

বৃষ্টির দিনেই তার জন্ম হয়েছিল। নানী আদর করে নাম রেখেছিলেন—রিমঝিম বৃষ্টি

মাঝে মাঝে রিমঝিম ভাবে, নামের কারণেই কি বৃষ্টির প্রতি তার এত দুর্বলতা?

বৃষ্টি নামলেই ঘরে থাকতে পারে না। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো ছাদে যায়, কখনো কোনো গন্তব্য ছাড়াই রাস্তায় হাঁটে। জোছনার প্রতিও তার একই দুর্বলতা। পূর্ণিমার রাতে ঘুম আসে না।

বন্ধুরা তাকে অদ্ভুত মেয়ে বলে।

রিমঝিম হাসে।

তার মনে হয়, অদ্ভুত হওয়া যদি নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়ার আরেক নাম হয়, তাহলে অদ্ভুতই ভালো।

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলছিল। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামল।

রিমঝিম ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল।

বান্ধবী মৌ অবাক হয়ে বলল,

—কোথায় যাচ্ছিস?

—নূহাশ পল্লী।

—এখন? 

রিমঝিম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—বৃষ্টির দিনে হুমায়ূন আহমেদের নুহাশপল্লীর কাছে না গেলে বৃষ্টির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।

মৌ হেসে বলল,

—একা যাবি?

—হ্যাঁ।

—ভয় করবে না?

রিমঝিম একটু থেমে বলল,

—ভয় করবে। তবু যাব। তারপর হেসে বলল, নানীর তাবিজ আছে না শরীরে।

—হ্যা তুই তো তাবিজের বস্তা।

—দেখিস, মৌ, আমি একা একাই চলে যেতে পারবো।

সন্ধ্যায় নূহাশ পল্লীর লীলাবতী দীঘির পাশে বসে রিমঝিম বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার মনে হলো, বৃষ্টি মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে।

হঠাৎ মনে হলো, সমাজ মেয়েদের জন্য কতগুলো অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছে।

একটি মেয়ে একা কোথাও গেলে প্রশ্ন।

রাতে ফিরলে প্রশ্ন।

বৃষ্টিতে ভিজলে প্রশ্ন।

জোছনা দেখতে বের হলে প্রশ্ন।

কেন? লন্ডন, ফ্রান্স, জার্মানীে, এমন কি ভারতের মেয়েরাও কত স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। আমাদের দেশের মানুষগুলো কেন এমন?

একজন ছেলে একা বের হলে সে স্বাধীন।

একজন মেয়ে একা বের হলে সে কেন সন্দেহের?

রিমঝিম নিজের কাছে করা এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর পেল না।

শুধু মনে হলো, নিজের জীবনের সামান্য পথটুকু নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার তারও আছে।

রাত হয়ে যাওয়ায় সে ফিরতে পারল না। এক অচেনা নারী তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। অবশ্য ঐ নারীটি ভাল ছিলেন। ঐ নারীর একটা মেয়ে আছে। ওর সাথে ঘুমাতে হলো রাতে। 

রাতের শেষভাগে বৃষ্টি থেমে গেল।

মেঘ সরে চাঁদ উঠল।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে রিমঝিম দেখল—ভেজা উঠোনের ওপর এক টুকরো জোছনা পড়ে আছে।

 মেয়েটি পাশে এসে জিজ্ঞেস করল,

—জোছনা ভালো লাগে?

রিমঝিম মৃদু হেসে বলল,

—খুব।

—কেন?

রিমঝিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—জানি না। মনে হয়, জোছনার আলোয় মানুষ নিজের সঙ্গে দেখা করতে পারে।

ঢাকায় বাসায় ফিরে আসার পর নানী জয়তুননেসা তার হাতে নতুন একটা তাবিজ বেঁধে দিলেন। তিনি ওদের সাথে থাকেন। নানীকে উপেক্ষা করার সাহস পরিবারের কারো নেই। তিনি এসব কুসংস্কারে গভীর বিশ্বাস করেন। বৃষ্টিকে বলেন,

—একা একা এত ঘোরাঘুরি করিস না। জিনে ধরবে।

রিমঝিম তাবিজটির দিকে তাকিয়ে হাসল। নানীকে বলল, নানী এ নিয়ে তো আমার শরীরে সাতটি তাবিজ বেঁধে দিয়েছো। হাতে, গলায়, কোমরে সব জায়গায় তাবিজ আর তাবিজ, তারপরও আমার বৃষ্টিতে ভেজা কি বন্ধ করতে পারলে?

নানী মৃদু ধমক দিয়ে বলেন,

—চুপ থাক, তাবিজ ফেলবি না। বিপদ আপদ থেকে এগুলো তোকে রক্ষা করবে।

নানীর ভয়কে সে অবহেলা করতে পারে না। সেই ভয়েও তো ভালোবাসা আছে।

তবু মনে মনে ভাবল—

জিনের ভয় দেখিয়ে মেয়েদের কতদিন ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হবে?

তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

রিমঝিমের মনে হলো, তার নামের মধ্যে যেমন বৃষ্টি আছে, তেমনি তার স্বভাবের মধ্যেও।

হয়তো নামের কারণেই।

হয়তো জন্মের দিনের কারণে।

অথবা হয়তো বৃষ্টিকে ভালোবাসার কোনো কারণই লাগে না।

সে শুধু জানে—

বৃষ্টি এলে তাকে জানালা খুলতে হয়।
জোছনা এলে তাকে আকাশের দিকে তাকাতে হয়।
আর জীবন এলে—নিজের মতো করে বাঁচতে হয়।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।

দূরে চাঁদ উঠেছে।

মেঘের ফাঁকে এক টুকরো জোছনা।

রিমঝিম বৃষ্টি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

লন্ডন, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬