ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে বিষ্মের বিষ্ময় মৃত সাগর !
তথ্য কণিকা ডেস্ক:
মোটরবোটটি ধীরে এগোচ্ছিল মৃত সাগর বা Dead Sea-এর লবণাক্ত বুকের ওপর। পানি কোথাও গভীর নীল, কোথাও হালকা ফিরোজা। তীরজুড়ে জমে থাকা সাদা লবণ দূর থেকে বরফের মতো লাগে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নীরব পতন।
নৌকার চালক জ্যাক বেন জাকেন পানির দিকে ইশারা করে বললেন, “ওখানে আবার সিংকহোল তৈরি হয়েছে।” কয়েক বছর আগেও জায়গাটা ছিল স্বাভাবিক তীরভূমি। এখন তা বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন।
Dead Sea পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু ভূখণ্ডে, Israel, Jordan এবং Palestinian territories-এর মাঝখানে অবস্থিত। একসময় এটি ছিল বিস্ময়ের জলাধার—মানুষ পানিতে ডুবে না গিয়ে ভেসে থাকত অনায়াসে। আজ সেই জলাধারই সংকুচিত হচ্ছে দ্রুত গতিতে।
পরিবেশবিদদের হিসাব বলছে, প্রতি বছর পানির স্তর কয়েক ফুট করে নেমে যাচ্ছে। গত কয়েক দশকে আয়তন কমেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর সঙ্গে বাড়ছে সবচেয়ে ভয়ংকর সমস্যা—হঠাৎ তৈরি হওয়া সিংকহোল, যা রাস্তা, হোটেল আর পর্যটন অবকাঠামো গিলে ফেলছে।
এই পরিবর্তনের মূল কারণ মানুষেরই তৈরি। প্রধান পানির উৎস Jordan River থেকে পানি ব্যাপকভাবে কৃষি ও নগর ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে মৃত সাগরে পৌঁছানো প্রবাহ অনেক কমে গেছে।
একই সঙ্গে Dead Sea Works এবং Arab Potash Company-এর মতো শিল্প প্রতিষ্ঠান পানি পাম্প করে লবণ ও খনিজ আহরণ করছে। এতে জলাধারের ভারসাম্য আরও নষ্ট হচ্ছে।
পানি কমার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে রাসায়নিক গঠনও। তলদেশে জমছে সাদা লবণের স্ফটিক, যা দূর থেকে সুন্দর দেখালেও আসলে পতনের চিহ্ন।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিবর্তন হচ্ছে সিংকহোল। মাটির নিচে লবণ গলে ফাঁপা জায়গা তৈরি হচ্ছে, আর হঠাৎ করেই ভূমি ধসে পড়ছে। এখন চারপাশে হাজারো এমন গর্ত তৈরি হয়েছে, যা আগে থেকে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব।
সমাধানের চেষ্টা বহু বছর ধরে চলছে। লোহিত সাগর থেকে পানি এনে পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা ছিল সবচেয়ে আলোচিত, কিন্তু ব্যয়, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক জটিলতায় তা থমকে আছে। আরেকটি প্রস্তাব ছিল Jordan River-এর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের পানি সংকটে সেটিও কঠিন বাস্তবতা।
শিল্প বন্ধ করাও সহজ নয়, কারণ এতে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে ICL Group-সহ প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত সংস্কারের কথা বললেও দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন আর “বাঁচানো যাবে কি না” নয়—বরং “কতটা ধীর করা যাবে”। কারণ ডেড সি শুধু একটি জলাধার নয়, এটি একটি ধীরগতির পরিবেশগত বিপর্যয়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।